Showing posts with label Shahi Bukhari. Show all posts
Showing posts with label Shahi Bukhari. Show all posts

Jan 28, 2020

সহীহ বুখারী, অধ্যায়-৪৭, বিষয়: অসিয়াত।

bukhari osaiat, shahi bukhari

২৫৫১। আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) ... আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন মুসলিম ব্যাক্তির উচিত নয় যে, তার অসীয়াতযোগ্য কিছু (সম্পদ) রয়েছে সে দু’রাত কাটাবে অথচ তার কাছে তার অসীয়াত লিখিত থাকবে না। মুহাম্মদ ইবনু মুসলিম (রহঃ) এ বর্ণনায় মালিক (রহঃ) এর অনুসরণ করেছেন। এ সনদে আমর (রহঃ) ইবনু উমর (রাঃ) এর মাধ্যমে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন।
২৫৫২। ইবরাহীম ইবনু হারিস (রহঃ) ... রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শ্যালক অর্থাৎ উম্মুল মুমিনীন জুওয়াইরিয়া বিনত হারিসের ভাই আমর ইবনুুর হারিস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ইনিতকালের সময় তাঁর সাদা খচ্চরটি, তাঁর হাতিয়ার এবং সে জমি যা তিনি সাদকা করেছিলেন, তাছাড়া কোন স্বর্ণ বা রৌপ্য মুদ্রা, কোন দাস-দাসী কিংবা কোন জিনিস রেখে যাননি।’
২৫৫৩। খাল্লাদ ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) ... তালহা ইবনু মুসাররিফ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু আদিফা (রাঃ) এর নিকট জিজ্ঞাসা করলাম, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি অসীয়াত করেছিলেন? তিনি বলেন, না। আমি বললাম, তাহলে কিভাবে লোকদের উপর অসীয়াত ফরয করা হল কিংবা ওয়াসীয়াতের নির্দেশ দেওয়া হল? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কিতাবের (অনুযায়ী আমল করার) অসীয়াত করেছেন।
২৫৫৪। আমর ইবনু যুরারা (রহঃ) ... আসওয়াদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাহাবীগণ আয়িশা (রাঃ) এর কাছে আলোচনা করলেন যে, আলী (রাঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওয়াসী ছিলেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন ‘তিনি কখন তাঁর প্রতি অসীয়াত করলেন? অথচ আমি তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আমার বুকে অথবা বলেছেন আমার কোলে হেলান দিয়ে রেখেছিলাম। তখন তিনি পানির তস্তুরি চাইলেন, তারপর আমার কোলে ঝুকে পড়লেন। আমি বুঝতেই পারিনি যে, তিনি ইন্তেকাল করেছেন। অতএব তাঁর প্রতি কখন অসীয়াত করলেন?
২৫৫৫। আবূ নু‘আইম (রহঃ) ... সা‘দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার আমাকে রোগাক্রান্ত অবস্থায় দেখতে আসেন। সে সময় আমি মক্কায় ছিলাম। কোন ব্যাক্তি যে স্থান থেকে হিযরত করে, সেখানে মৃত্যু বরণ করাকে তিনি অপছন্দ করতেন। এজন্য তিনি বলতেন, আল্লাহ রহম করুক ইবনু আফরা-এর উপর। আমি বললাম, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি কি আমার সমুদয় মালের ব্যবহারের অসীয়াত করে যাব? তিনি বললেন, না। আমি আরজ করলাম, তবে অর্ধেক? তিনি ইরশাদ করলেন, না। আমি আরজ করলাম, তবে এক তৃতীয়াংশ আর এক তৃতীয়াংশও অনেক। ওয়ারিসগণকে দরিদ্র পরমুখাপেক্ষী করে রেখে যাওয়ার চেয়ে ধনী অবস্থায় রেখে যাওয়া শ্রেয়। তুমি যখনই কোন খরচ করবে, তা সাদকারূপে গন্য হবে। এমনকি সে লোকমাও যা তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দিবে। হয়ত আল্লাহ পাক তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন এবং লোকেরা তোমার দ্বারা উপকৃত হবেন, আবার কিছু লোক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সে সময় তার একটি মাত্র কন্যা ছাড়া কেউ ছিল না।
২৫৫৬। কুতাইবা ইবনু সাঈদ (রহঃ) ... ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকেরা যদি এক চতুর্থাংশে নেমে আসত (তবে ভাল হতো) কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এক তৃতীয়াংশ এবং তৃতীয়াংশই বিরাট অথবা তিনি বলেছেন বেশ।
২৫৫৭। মুহাম্মদ ইবনু আবদুর রহীম (রহঃ) ... আমির ইবনু সা’দ (রাঃ) এর পিতা সা‘দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি (একবার) অসুস্থ হয়ে পড়লে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখতে আসেন। আমি বললাম, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর কাছে দু‘আ করুন, তিনি যেন আমাকে পেছন দিকে ফিরিয়ে না নেন।’ তিনি বললেন, ‘আশা করি আল্লাহ তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন এবং তোমার দ্বারা লোকদের উপকৃত করবেন।’ আমি বললাম, আমি অসীয়াত করতে চাই। আমার তো একটি মাত্র কন্যা রয়েছে।’ আমি আরো বললাম, আমি অর্ধেক অসীয়াত করতে চাই।’ তিনি বললেন, অর্ধেক অনেক বেশী। আমি বললাম, এক তৃতীয়াংশ। তিনি বললেন, আচ্ছা এক তৃতীয়াংশ এবং এক তৃতীয়াংশ বেশী বা তিনি বলেছেন বিরাট। সা‘দ (রাঃ) বলেন, এরপর লোকেরা এক তৃতীয়াংশ অসীয়াত করতে লাগল। আর তা-ই বৈধ হল।
২৫৫৮। আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা (রহঃ) ... নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মীনি আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উতবা ইবনু আবূ ওয়াক্‌কাস (রাঃ) তাঁর ভাই সা‘দ ইবনু আবূ ওয়াককাস (রাঃ) কে এই বলে অসীয়াত করেন যে, যামআর দাসীর ছেলেটি আমার ঔরসজাত। তাকে তুমি তোমার অধিকারে আনবে। মক্কা বিজয়ের বছর সা‘দ (রাঃ) তাকে নিয়ে নেন এবং বলেন, সে আমার ভাতিজা (আমার ভাই) আমাকে এর ব্যাপারে অসীয়াত করে গেছেন। আবদ ইবনু যামআ (রাঃ) দাঁড়িয়ে বললেন, সে আমার ভাই এবং আমার পিতার দাসীর পুত্র। আমার পিতার বিছানায় তার জন্ম হয়েছে। তারা উভয়ই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আসেন।
সা‘দ (রাঃ) বলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে আমার ভাইয়ের পুত্র এবং তিনি আমাকে তার সম্পর্কে অসীয়াত করে গেছেন। আবদ ইবনু যামআ (রাঃ) বললেন, সে আমার ভাই এবং আমার পিতার দাসীর পুত্র। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আবদ ইবনু যামআ, সে তোমারই প্রাপ্য। কেননা যার বিছানায় সন্তান জন্মেছে, সে-ই সন্তানের অধিকারী। ব্যাভিচারীর জন্য রয়েছে পাথর। তারপর তিনি সাওদা বিনতে যামআ (রাঃ) কে বললেন, ‘তুমি এই ছেলেটি থেকে পর্দা কর।’ কেননা তিনি ছেলেটির সঙ্গে উতবা’র সা’দৃশ্য দেখতে পান। ছেলেটির আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়া পর্যন্ত সে কখনো সাওদা (রাঃ) কে দেখেনি।
২৫৫৯। হাসসান ইবনু আবূ আববাদ (রহঃ) ... আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, এক ইয়াহুদী একটি মেয়ের মাথা দুইটি পাথরের মাঝে রেখে তা থেতলে ফেলে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, কে তোমাকে এমন করেছে? কি অমুক না অমুক ব্যাক্তি? অবশেষে যখন সেই ইয়াহুদীর নাম নেওয়া হল তখন মেয়েটি মাথা দিয়ে ইশারা করল, হ্যাঁ। তারপর সেই ইয়াহুদীকে নিয়ে আসা হল এবং তাকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদের পর অবশেষে সে স্বীকার করল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ব্যাপারে নির্দেশ দিলেন। সে মতে পাথর দিয়ে তার মাথা থেঁতলিয়ে দেওয়া হল।
২৫৬০। মুহাম্মদ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) ... ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (সেকালে) উত্তরাধিকারী হিসাবে সম্পদ পেতো সন্তান আর পিতা-মাতার জন্য ছিল অসীয়াত। এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁর পছন্দ মোতাবেক এ বিধান রহিত করে ছেলের অংশ মেয়ের দ্বিগুন, পিতামাতা প্রত্যেকের জন্য এক ষষ্ঠামাংশ, স্ত্রীর জন্য (যদি সন্তান থাকে) এক অষ্টমাংশ, (না থাকলে) এক চতুর্থাংশ, স্বামীর জন্য (সন্তান না থাকলে) অর্ধেক, (থাকলে) এক চতুর্থাংশ নির্ধারণ করেন।
২৫৬১। মুহাম্মদ ইবনু আলা (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যাক্তি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! উত্তম সাদকা কোনটি? তিনি বলেন, সুস্থ এবং সম্পদের প্রতি অনুরাগ অবস্থায় দান খায়রাত করা, যখন তোমার ধনী হওয়ার আকাঙখা থাকে এবং তুমি দারিদ্রের আশংকা রাখ, আর তুমি এভাবে অপেক্ষা থাকবে না যে, যখন তোমার প্রাণ কন্ঠাগত হয়ে আসে, তখন তুমি বলবে, অমুকের জন্য এতটুকু, অমুকের জন্য এতটুকু অথচ তা অমুকের জন্য হয়েই গেছে।
২৫৬২। সুলাইমান ইবনু দাউদ আবূ রাবী‘ (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মুনাফিকের আলামত তিনটি-যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, আমানত রাখলে তা খিয়ানত করে এবং প্রতিশ্রুতি দিলে তা ভঙ্গ করে।
২৫৬৩। মুহাম্মদ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) ... হাকীম ইবনু হিযাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আমি সাওয়াল করলাম, তিনি আমাকে দান করলেন। তারপর তিনি আমাকে বললেন, ‘হে হাকীম! এই ধন-সম্পদ, সবুজ-শ্যামল, মধুর। যে ব্যাক্তি দানশীলতার মনোভাব নিয়ে তা গ্রহণ করবে, তাতে তার বরকত হবে। আর যে ব্যাক্তি প্রতিক্ষা কাতর অন্তরে তা গ্রহণ করবে, তাতে তার বরকত হবে না। সে ঐ ব্যাক্তির মত যে খায়; কিন্তু তৃপ্ত হয় না। উপরের (দাতার) হাত নীচের (গ্রহীতার) হাতের চাইতে উত্তম।’ হাকীম (রাঃ) বলেন, তারপর আমি বললাম, ইয়া রাসূলআল্লাহ! সে স্বত্বার কসম, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন, আপনার পরে আমি দুনিয়া থেকে বিদায়ের আগে আর কারো কিছু চাইব না। (কোন কিছু নেব না)
এরপর আবূ বকর (রাঃ) কিছু দান করার জন্য হাকীমকে আহবান করেন, কিন্তু হাকীম (রাঃ) তাঁর কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। তারপর উমর (রাঃ)-ও হাকীম (রাঃ) কে কিছু দান করার জন্য ডেকে পাঠান, কিন্তু তাঁর কাছ থেকেও কিছু গ্রহণ করতে তিনি অস্বীকার করেন। তখন উমর (রাঃ) বলেন, হে মুসলিম সমাজ! আমি আল্লাহ প্রদত্ত গনীমতের মাল থেকে প্রাপ্য তার অংশ তাঁর সামনে পেশ করেছি, কিন্তু তিনি তা নিতে অস্বীকার করেছেন; হাকীম (রাঃ) তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরে আর কারো নিকট কিছু চাননি।
২৫৬৪। বিশর ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) ... ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্ববান এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। তাই শাসক হলেন দায়িত্ববান, তার দায়িত্ব সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্ববান এবং তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। স্ত্রী তার স্বামীর ঘরের সম্পদের দায়িত্ববান, তার সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। গোলাম তার মালিকের ধন-সম্পদের দায়িত্ববান, তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। রাবী বলেন, আমার মনে হয় তিনি এও বলেছেন যে, পুত্র তার পিতার সম্পদের দায়িত্ববান।
২৫৬৫। আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) ... আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ তালহা (রাঃ) কে বলেন আমার মত হল, তোমার বাগানটি তোমার আত্মীয়-স্বজনকে দিয়ে দাও। আবূ তালহা (রাঃ) বলেন, আমি তা-ই করব ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাই আবূ তালহা (রাঃ) তার বাগানটি তার আত্মীয়-স্বজন ও চাচাতো ভাইয়ের মধ্যে ভাগ করে দেন। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, যখন এই আয়াতটি নাযিল হলঃ (হে মুহামমদ) আপনার নিকট আত্মীয়বর্গকে সতর্ক করে দেন। (২৬ঃ ১৪)। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরায়শ সম্প্রদায়ের বিভিন্ন গোত্রদের ডেকে বললেন, হে বানু ফিহর, হে বানূ আদী, তোমরা সতর্ক হও। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন যে, যখন কুরআনের এই আয়াত নাযিল হলঃ (হে মুহাম্মদ) আপনি আপনার নিকটবর্গকে সতর্ক করে দিন (২৬ঃ ২১৪)। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে কুরায়শ সম্প্রদায়।
২৫৬৬। আবূল ইয়ামান (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আল্লাহ তায়ালা কুরানের এই আয়াতটি নাযিল করলেন, (হে মুহাম্মদ) আপনি আপনার নিকটাত্মীয়বর্গকে সতর্ক করে দিন (২৬ঃ ২১৪) তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ালেন এবং বললেন, ‘হে কুরায়শ সম্প্রদায়! কিংবা অনুরূপ শব্দ বললেন, তোমরা (আল্লাহর আযাব থেকে) আত্মরক্ষা কর। আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমাদের কোন উপকার করতে পারব না। হে বানূ আবাদ মানাফ! আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমাদের কোন উপকার করতে পারব না। হে আব্বাস ইবনু আব্দুল মুত্তালিব! আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমাদের কোন উপকার করতে পারব না। হে সাফিয়্যা! রাসূলুল্লাহর ফুফু, আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমাদের কোন উপকার করতে পারব না। হে ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ! আমার ধন-সম্পদ থেকে যা ইচ্ছা চেয়ে নাও। আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমাদের কোন উপকার করতে পারব না।
আসবাগ (রহঃ) ইবনু ওয়াহব (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে হাদীস বর্ণনায় আবূল ইয়ামান (রহঃ)-এর অনুসরণ করেছেন।
২৫৬৭। কুতাইবা (রহঃ) ... আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন দেখতে পেলেন যে, এক ব্যাক্তি কুরবানীর উট হাকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে বললেন, এর উপর সওয়ার হও। সে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি তো কুরবানীর উট। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৃতীয়বার বা চতুর্থবার তাকে বললেন, তার উপর সওয়ার হয়ে যাও, দুর্ভোগ তোমার জন্য কিংবা বললেন, তোমার প্রতি আফসোস।
২৫৬৮। ইসমাঈল (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যাক্তিকে দেখতে পেলেন যে, সে একটি কুরবানীর উট হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে বললেন, এর উপর সওয়ার হও। লোকটি বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি তো কুরবানীর উট। তিনি দ্বিতীয়বার কিংবা তৃতীয়বার বললেন, এর উপর সওয়ার হও, দুর্ভোগ তোমার জন্য।
২৫৬৯। মুহাম্মদ (রহঃ) ... ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, সা‘দ ইবনু উবাদা (রাঃ)-এর মা মারা গেলেন এবং তিনি সেখানে অনুপস্থিত ছিলেন। পরে সা‘দ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার মা আমার অনুপস্থিতিতে মারা যান। আমি যদি তার পক্ষ থেকে কিছু সাদকা করি, তা হলে কি তা তাঁর কোন উপকারে আসবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। সা‘দ (রাঃ) বললেন, ‘তাহলে আমি আপনাকে সাক্ষী করছি আমার মিকরাফ নামক বাগানটি তাঁর জন্য সাদকা করলাম।
২৫৭০। ইয়াহইয়া ইবনু বুকাইর (রহঃ) ... কা‘ব ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আমার তাওবা (কবুলের শুকরিয়া) হিসাবে আমি আমার যাবতীয় মাল আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলুল্লাহ এর উদ্দেশ্যে সাদকা করে মুক্ত হতে চাই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কিছু মাল নিজের জন্য রেখে দাও, তা তোমার জন্য উত্তম। আমি বললাম, তা হলে আমি আমার খায়বারের অংশটি নিজের জন্য রেখে দিলাম।
২৫৭১। আবূ নুমান মুহাম্মদ ইবনু ফাযল (রহঃ) ... ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকদের ধাররা, উক্ত আয়াতটি মানসুখ হয়ে গেছে; কিন্তু আল্লাহর কসম। আয়াতটি মানসূখ হয়নি; বরং লোকেরা এর উপর আমল করতে অনীহা প্রকাশ করছে। আত্মীয় দু’ ধরনের-এক, আত্মীয় যারা ওয়ারিস হয়, এবং তারা উপস্থিতদের কিছু দিবে। দুই, এমন আত্মীয় যারা ওয়ারিস নয়, তারা উপস্থিতদের সঙ্গে সদালাপ করবে এবং বলবে, আমাদের অধিকার কিছু নেই, যা তোমাদের দিতে পারি।
২৫৭২। ইসমাঈল (রহঃ) ... আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, একজন সাহাবী নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললেন, আমার মা হঠাৎ মারা যান। আমার ধারনা যে, তিনি যদি কথা বলতে পারতেন, তাহলে সাদক করতেন। আমি কি তার পক্ষ থেকে সাদকা করে দিতে পারি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, তুমি তার পক্ষ থেকে সাদকা কর।
২৫৭৩। আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) ... ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, সা’দ ইবনু উবাদা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে জানতে চাইলেন যে, আমার মা মারা গেছেন এবং তার উপর মান্নত ছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তার পক্ষ থেকে তা আদায় কর।
২৫৭৪। ইবরাহীম ইবনু মূসা (রহঃ) ... ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, বানূ সাইদার নেতা সা‘দ ইবনু উবাদা (রাঃ)-এর মা মারা গেলেন। তখন তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। তারপর তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার মা আমার অনুপস্থিতিতে মারা গেছেন। এখন আমি যদি তার পক্ষ থেকে সাদকা করি, তবে তা কি তার কোন উপকারে আসবে? তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ। সা‘দ (রাঃ) বললেন, ‘তাহলে আপনাকে সাক্ষী করে আমি আমার মিখরাফের বাগানটি তাঁর উদ্দেশ্যে সাদকা করলাম।
২৫৭৫। আবূল ইয়ামান (রহঃ) ... উরওয়া ইবনু যুবাইর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, তিনি আয়িশা (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করেনঃ ‏وَإِنْ خِفْتُمْ أَنْ لاَ تُقْسِطُوا فِي الْيَتَامَى فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ‏ তোমরা যদি আশংকা কর যে, ইয়াতীম মেয়েদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না, তবে বিয়ে করবে, যাকে তোমাদের ভাল লাগে (৪ঃ ৩)। আয়াতটির অর্থ কি? আয়িশা (রাঃ) বললেন, এখানে সেই ইয়াতীম মেয়েদের উদ্দেশ্য করা হয়েছে, যে তার অভিভাবকের লালন-পালনে থাকে। এরপর সে অভিভাবক তার রূপ-লাবন্য ও ধন-সম্পদের আকৃষ্ট হয়ে, তার সমমানে মেয়েদের প্রচলিত মাহর থেকে কম দিয়ে তাকে বিয়ে করতে চায়। অতএব যদি মাহর পূর্ণ করার ব্যাপারে এদের প্রতি ইনসাফ করতে না পারে তবে ঐ অভিভাবকদেরকে নিষেধ করা হয়েছে এদের বিবাহ করতে এবং নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাদের ছাড়া তোমরা অন্য মেয়েদের বিবাহ করতে।
আয়িশা (রা বলেন, এরপর লোকেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এ সম্পর্কে জানতে চাইলে আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাযিল করেনঃ ‏وَيَسْتَفْتُونَكَ فِي النِّسَاءِ قُلِ اللَّهُ يُفْتِيكُمْ فِيهِنَّ এবং লোকে আপনার কাছে মহিলাদের বিষয়ে জানতে চায়। বলুন, আল্লাহ তোমাদের তাদের সম্বন্ধে ব্যবস্থা জানোাচ্ছেন (৪ঃ ১২৭)। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে বর্ণনা করেন যে, ইয়াতীম মেয়েরা সুন্দর ও সম্পদশালী হলে অভিভাবকেরা তাদের বিয়ে করতে আগ্রহী হয়, কিন্তু পূর্ণ মাহর প্রদান করে না। আবার ইয়াতীম মেয়েরা গরীব হলে এবং সুশ্রী না হলে তাদের বিয়ে করতে চায় না বরং অন্য মেয়ে তালাশ করে। আয়িশা (রাঃ) বলেন যে, আকর্ষনীয় না হলে তারা যেমন ইয়াতীম মেযেদের পরিত্যাগ করে, তেমনি আকর্ষনীয় মেয়েদেরও তারা বিয়ে করতে পারবে না, যদি তাদের ইনসাফ মাফিক পূর্ণ মাহর প্রদান এবং তাদের হক যথাযথভাবে আদায় না করে।
২৫৭৬। হারূন (রহঃ) ... ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময়ে উমর (রাঃ) নিজের কিছু সম্পত্তি সাদকা করেছিলেন, তা ছিল, ছামাগ নামে একটি খেজুর বাগান। উমর (রাঃ) বলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি একটি সম্পদ পেয়েছি, যা আমার নিকট খুবই পছন্দনীয়। আমি সেটি সাদকা করতে চাই।’ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মূল সম্পদটি এ শর্তে সাদকা কর, যে, তা বিক্রি করা যাবে না, দান করা যাবে না এবং কেউ ওয়ারিস হবে না, বরং তার ফল (আল্লাহর পথে) দান করা হবে। তারপর উমর (রাঃ) সেটি এভাবেই সাদকা করলেন। তার এ সাদকা ব্যয় হবে আল্লাহর রাস্তায়, দাস মুক্তির ব্যাপারে, মিসকীন, মেহমান, মূসাফির ও আত্মীয়দের জন্য। এর যে মুতাওল্লালী হবে তার জন্য তা থেকে সঙ্গত পরিমাণ আহার করলে কিংবা বন্ধু বান্ধবকে খাওয়ালে কোন দোষ নেই। তবে তা সঞ্চয় করতে পারেব না।
২৫৭৭। উবাইদ ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) ... আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (আল্লাহ তাআলার বাণীঃ) যে বিত্তবান সে যেন বিরত থাকে আর যে বিত্তহীন সে যেন সঙ্গত পরিমাণ ভোগ করে (৪: ৬)। আয়াতটি ইয়াতীমের অভিভাবক সম্বন্ধে নায়িল হয়েছে। অভিভাবক যদি অভাবগ্রস্ত হয়, তাহলে বিধি মোতাবেক ইয়াতীমের সম্পত্তি থেকে প্রয়োজন পরিমাণ খেতে পারবে।
২৫৭৮। আবদুল আযীয ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে তোমরা বিরত থাকবে। সাহাবীগন বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেগুলো কি? তিনি বললেন, (১) আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা। (২) যাদু (৩) আল্লাহ তাআলা যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, শরীয়ত সম্মত ব্যতীরেকে তাকে হত্যা করা (৪) সুদ খাওয়া (৫) ইয়াতীমের মাল গ্রাস করা (৬) রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং (৭) সরল প্রকৃতির সতী মুমিন নারীদের অপবাদ দেওয়া।
২৫৭৯। ইয়াকুব ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) ... আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় এলেন, তখন তাঁর কোন খাদিম ছিল না। আবূ তালহা (রাঃ) আমার হাত ধরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আমাকে নিয়ে গেলেন এবং বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আনাস একজন বুদ্ধিমান ছেলে। সে আপনার খেদমত করবে।’ এরপর প্রবাসে ও আবাসে আমি তাঁর খেদমত করেছি। আমার কৃত কোন কাজ সম্পর্কে তিনি কখনো বলেন নি, তুমি এরূপ কেন করলে? কোন কাজ না করলে তিনি বলেন নি, তুমি এটি এরূপ কেন করলে না।?
২৫৮০। আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা (রহঃ) ... আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, মদিনায় আনসাদের মধ্যে তালহার খেজুর বাগান-সম্পদ সবচাইতে বেশী ছিল। আর সকল সম্পদের মধ্যে তার কাছে সবচাইতে প্রিয় সম্পদ ছিল মসজিদের (নববীর) সামনে অবস্থিত বায়রুহা বাগানটি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে বাগানে যেতেন এবং এর সুস্বাদু পানি পান করতেন। আনাস (রাঃ) বলেন, যখন নাযিল হলঃ ‏لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ‏ তোমরা যা ভালবাস তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা নেকী হাসিল করতে পারবে না। আবূ তালহা (রাঃ) দাঁড়িয়ে বলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ বলেছেনঃ তোমরা যা ভালবাস, তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো নেকী হাসিল করতে পারবে না। আমার কাছে সবচাইতে প্রিয় সম্পদ হল বায়রুহা। সেটি আল্লাহর নামে সাদকা। আমি আল্লাহর কাছে এর নামে সওয়াব ও কিয়ামতের সঞ্চয়ের আশা করি। আল্লাহর মর্জি অনুযায়ী আপনি তা ব্যয় করুন।’
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘বেশ, এটি লাভজনক সম্পদ অথবা (বললেন), অস্থায়ী সম্পদ।’ ইবনু মাসলামা সন্দেহ পোষণ করেন। (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন) তুমি যা বলেছ, আমি তা শুনেছি। আমার মতে তুমি তা তোমর আত্মীয়দের মধ্যে বন্টন করে দাও। আবূ তালহা (রাঃ) বলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তা-ই করব।’ তারপর তা তিনি তাঁর আত্মীয় ও চাচাতো ভাইদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। ইসমাঈল, আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ, ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রাঃ) মালিক (রহ) এর (সন্দেহ ছাড়াই) رَايِحٌ (অস্থায়ী) বর্ণনা করেছেন।
২৫৮১। মুহাম্মদ ইবনু আবদুর রহীম (রহঃ) ... ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, এক সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট জিজ্ঞাসা করলেন এবং তার মা মারা গেছেন। তার পক্ষ থেকে যদি আমি সাদকা করি তাহলে তা কি তার উপকারে আসবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। সাহাবী বললেন, আমার একটি বাগান আছে, আপনাকে সাক্ষী রেখে আমি তার পক্ষ থেকে সাদকা করলাম।
২৫৮২। মুসাদ্দাদ (রহঃ) ... আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদ তৈরীর নির্দেশ দিলেন। তারপর বললেন, হে বানূ নাজ্জার, তোমরা এই বাগানটির মূল্য নির্ধারণ করে আমার কাছে বিক্রি কর। তারা বলল, এরূপ নয়। আল্লাহর কসম! আমরা একমাত্র আল্লাহর কাছেই এর মূল্যের আশা রাখি।
২৫৮৩। মুসাদ্দাদ (রহঃ) ... ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর (রাঃ) খায়বারে কিছু জমি লাভ করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বললেন, আমি এমন ভাল একটি জমি পেয়েছি, যা ইতিপূর্বে কখনো পাইনি। আপনি এ সম্পর্কে আমাকে কি নির্দেশ দেন? তিনি বললেন, তুমি ইচ্ছা করলে আসল জমিটি ওয়াকফ করে তার উৎপন্ন সাদকা করতে পার। উমর (রাঃ) এটি গরীব, আত্মীয়-স্বজন, গোলাম আযাদ, আল্লাহর পথে, মেহমান ও মূসাফিরদের জন্য এ শর্তে সাদকা করলেন যে, আসল জমি বিক্রি করা যাবে না, কাউকে দান করা যাবে না, কেউ এর উত্তরাধিকারী হবে না। তবে যে এর মুতাওয়াল্লী হবে তার জন্য তা থেকে সঙ্গত পরিমাণ খেতে বা বন্ধু বান্ধবকে খাওয়ানোতে কোন দোষ নেই। তবে এ থেকে সঞ্চয় করবে না।
২৫৮৪। আবূ আসিম (রহঃ) ... ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, উমর (রাঃ) খায়বারে কিছু সম্পদ লাভ করেন এবং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে তাঁকে অবহিত করেন। তিনি বললেন, তুমি ইচ্ছা করলে সেটি সাদকা করতে পার। তারপর সেটি তিনি অভাবগ্রস্ত, মিসকীন, আত্মীয়-স্বজন ও মেহমানদের মধ্যে সাদকা করে দেন।
২৫৮৫। ইসহাক (রহঃ) ... আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় এলেন তখন মসজিদ নির্মানের নির্দেশ দিলেন এবং তিনি বললেন, ‘হে বানূ নাজ্জার! মূল্য নির্ধারিত করে তোমাদের এই বাগানটি আমার কাছে বিক্রি করে দাও।’ তারা বলল, ‘এরূপ নয়, আল্লাহর কসম! একমাত্র আল্লাহর কাছেই আমরা এর মূল্যের আশা রাখি।
২৫৮৬। মুসাদ্দাদ (রহঃ) ... ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, উমর (রাঃ) এক ব্যাক্তিকে তাঁর একটি ঘোড়া আল্লাহর রাস্তায় দিয়ে দেন, যেটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে আরোহণ করার জন্য দিয়েছিলেন, তিনি এক ব্যাক্তিকে আরোহণ করার জন্য দিলেন। উমর (রাঃ) কে জানোান হল যে, ঘোড়াটি সে ব্যাক্তি বিক্রির জন্য রেখে দিয়েছে। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ক্রয় করার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি বললেন, ‘তুমি তা ক্রয় করবে না এবং যা সাদকা করে দিয়েছে তা আর ফিরিয়ে নিবে না।
২৫৮৭। আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমার উত্তরাধিকারীরা কোন স্বর্ণ মুদ্রা এবং রোপ্য মুদ্রা ভাগাভাগি করবে না, বরং আমি যা কিছু রেখে গেলাম তা থেকে আমার সহধর্মিনীদের খরচ এবং কর্মচারীদের পারিশ্রমিক দেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে তা সাদকা।
২৫৮৮। কুতাইবা ইবনু সাঈদ (রহঃ) ... ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, উমর (রাঃ) তাঁর ওয়াকফে এই শর্তারোপ করেন যে, মুতাওয়াল্লী তা থেকে নিজে খেতে পারবে এবং বন্ধু বান্ধবকেও খাওয়াতে পারবে, তবে সম্পদ সঞ্চয় করতে পারবে না।
২৫৮৯। মুসাদ্দাদ (রহঃ) ... আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে বানূ নাজ্জার! তোমাদের বাগানটি মূল্য নির্ধারণ করে আমার কাছে বিক্রি করে দাও। তারা বলল, আমরা এর মূল্য একমাত্র আল্লাহর কাছে আশা রাখি।
২৫৯০। মুহাম্মদ ইবনু সাবিক (রহঃ) কিংবা ফযল ইবনু ইয়াকুব (রহঃ) ... মুহাম্মদ ইবনু সাবিক (রহঃ) এর মাধ্যমে জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তার পিতাকে উহুদের যুদ্ধে শহীদ করা হয়। তিনি ছ’টি কন্যা সন্তান রেখে যান আর তাঁর উপর ঋণও রেখে যান। খেজুর কাটার সময় হলে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বললাম, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি জানেন যে, আমার পিতাকে উহুদের যুদ্ধে শহীদ করা হয়েছে আর তিনি অনেক ঋন রেখে গেছেন। আমার মনে চায় যে, পাওনাদাররা আপনাকে দেখে নিক। (হয়ত এতে তারা কিছু ঋণ ছেড়ে দিতে পারে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন তুমি যাও। (খেজুর কেটে) এক এক রকম খেজুর এক এক স্থানে জমা কর। আমি তা-ই করলাম। এরপর তাঁকে অনুরোধ করে নিয়ে এলাম। লোকেরা (পাওনাদাররা) যখন দেখল, তখন তারা আমার কাছে জোর তাগাদা কারতে লাগল। তিনি তাদের এরুপ করতে দেখে খেজুরের বড় স্তুপটির চারদিকে তিনবার ঘুরলেন, এরপর তার উপর বসে পড়লেন।
তারপর বললেন, তোমার পাওনাদারদের ডাক। তিনি মেপে মেপে তাদের পাওনা আদায় করতে লাগলেন এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহ আমার পিতার সমস্ত ঋণ আদায় করে দিলেন। আর আল্লাহর কসম, আমি এতেই সন্তুষ্ট যে, আমার পিতার ঋণ আল্লাহ পরিশোধ করে দেন এবং আমি আমার বোনদের কাছে একটি খেজুরও নিয়ে না ফিরি। কিন্তু আল্লাহর কসম! সমস্ত স্তুপই যেমন ছিল তেমন রয়ে গেল। আমি সেই স্তুপটির দিকে বিশেষ ভাবে তাকিয়ে ছিলাম, যার উপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে ছিলেন। মনে হল যে, তা থেকে একটি খেজুরও কমেনি।
আবূ আবদুল্লাহ (ইমাম বুখারী) (রহঃ) বলেন, أُغْرُوا بِي এর অর্থ হল هِيجُوا بِي অর্থাৎ আমার কাছে জোর তাগাদা করতে লাগল। মহান আল্লাহর বাণীঃ ‘‘আমি তাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্ধেষ জাগরুক রেখেছি। ’’ (৫: ১৪)

সহীহ বুখারী, পঞ্চম খন্ড, অধ্যায়-৪৬, শর্তাবলী।

২৫৩০। ইয়াহইয়া ইবনু বুকাইর (রহঃ) ... মারওয়ান ও মিসওয়ার ইবনু মাখরামা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবীগণ থেকে বর্ণনা করেন, সেদিন (সুলহে হুদায়বিয়র দিন) সুহাইল ইবনু আমর যখন সন্ধিপত্র লিখলেন তখন সুহাইল ইবনু আমার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি এরূপ শর্ত আরোপ করল যে, আমাদের কেউ আপনার কাছে আসলে সে আপনার দ্বীন গ্রহন করা সত্ত্বেও আপনি তাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিবেন। আর আমাদের ও তার মাঝে হস্তক্ষেপ করবেন না। মুমিনরা এটা অপছন্দ করলেন এবং এতে ক্রুদ্ধ হলেন। সুহাইল এটা ছাড়া সন্ধি করতে অস্বীকার করল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে শর্ত মেনেই সন্ধিপত্র লেখালেন। সেদিন তিনি আবূ জানদাল (রাঃ) কে তার পিতা সুহাইল ইবনু আমরের কাছে ফেরত দিলেন এবং সে চুক্তি মেয়াদের কালে পুরুষদের মধ্যে যেই এসেছিল মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাকে ফেরত দিলেন।
মুমিন মহিলাগণও হিজরত করে আসলেন। সে সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে যাঁরা এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা ইবনু আবূ মুয়ায়ত (রাঃ) ছিলেন। তিনি ছিলেন যুবতী। তাঁর পরিজন তাদের নিকট একা তাকে ফেরত দেওয়ার জন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে দাবী জানালো। কিন্তু তাকে তিনি তাদের কাছে ফেরত দিলেন না। কেননা, সেই মহিলাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা আয়াত নাযিল করেছিলেনঃ মুমিন মহিলাগণ হিজরত করে তোমাদের কাছে আসলে তাদের তোমরা পরীক্ষা কর। আল্লাহ তাদের ঈমান সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন। যদি তোমরা জানতে পার যে, তারা মুমিন হবে তাদেরকে কাফিরদের নিকট ফেরত পাঠাবে না (৬০ঃ ১০)।
উরওয়া (রাঃ) বলেন, আয়িশা (রাঃ) আমাদের কাছে বর্ণণা করেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ‏إِذَا جَاءَكُمْ الْمُؤْمِنَاتُ مُهَاجِرَاتٍ এই আয়াতের ভিত্তিতেই তাদের পরীক্ষা করে দেখতেন। উরওয়া (রাঃ) বলেন, আয়িশা (রাঃ) বলেছেন, তাদের মধ্যে যারা এই শর্তে সম্মত হতো তাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু এ কথা বলতেন, ‘আমি তোমাকে বায়আত করলাম। আল্লাহর কসম! বায়আত গ্রহণে তারা কখনো কোন মহিলার হাত স্পর্শ করেনি। তিনি তাদের শুধু (মুখের) কথার মাধ্যমে বায়আত করেছেন।
২৫৩১। আবূ নুআইম (রহঃ) ... যিয়াদ ইবনু ইলাকা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জারীর (রাঃ) কে বলতে শুনেছি যে, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে বায়আত গ্রহন করলাম। তিনি আমাকে প্রত্যেক মুসলিমের প্রতি কল্যাণ কামনার শর্ত আরোপ করলেন।
২৫৩২। মুসাদ্দাদ (রহঃ) ... জারীর ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট বায়আত গ্রহণ করেছি, সালাত (নামায/নামাজ) কায়েম করার, যাকাত প্রদান করার এবং প্রত্যেক মুসলিমের জন্য কল্যাণ কামনা করার ব্যাপারে।
২৫৩৩। আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) ... আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, কেউ তাবীর করার পর খেজুর গাছ বিক্রি করলে বিক্রেতা তার ফল পাবে, অবশ্য ক্রেতা শর্তারোপ করলে ভিন্ন কথা অর্থাৎ সে পাবে।
২৫৩৪। আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা (রহঃ) ... আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বারীরা (রাঃ) একবার তাঁর কাছে এসে তার চুক্তি পত্রের (অর্থ আদায়ের) ব্যাপারে সাহায্য প্রার্থনা করল, তখন পর্যন্ত সে চুক্তির অর্থ কিছুই আদায় করেনি। আয়িশা (রাঃ) তাকে বললেন, ‘তুমি তোমার মালিকের কাছে ফিরে যাও। তারা যদি ইহা পছন্দ করে যে, আমি তোমার পক্ষ থেকে তোমার চুক্তিপত্রের প্রাপ্য পরিশোধ করে দিব, আর তোমার ওয়ালা আমার জন্য থাকবে, তাহলে আমি তাই করব।’ বারীরা (রাঃ) তার মালিককে সে কথা জানালে তারা অস্বীকার করল এবং বলল, তিনি যদি তোমাকে দিয়ে সাওয়াব হাসিল করতে চান তবে করুন, তোমার ওয়ালা কিন্তু আমাদেরই থাকবে। আয়িশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সে কথা জানালে তিনি তাঁকে বললেন, ‘তুমি তাকে খরীদ কর এবং আযাদ করে দাও। ওয়ালা সে-ই পাবে যে আযাদ করবে।’
২৫৩৫। আবূ নুআইম (রহঃ) ... জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি তাঁর এক উটের উপর সওয়ার হয়ে ভ্রমন করছিলেন, সেটি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। তিনি বললেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন এবং উটটিকে (চলার জন্য) আঘাত করে সেটির জন্য দু’আ করলেন। পলে উটটি এত দ্রুত চলতে লাগলো যে, কখনো তেমন দ্রুত চলেনি। তারপর তিনি বললেন, ‘এক উকিয়ার বিনিময়ে এটি আমার কাছে বিক্রি কর।’ আমি বললাম, না। তিনি বললেন, ‘এটি আমার কাছে এক উকিয়ার বিনিময়ে বিক্রি কর।’ তখন আমি সেটি বিক্রি করলাম। কিন্তু আমার স্বজনের কাছে পৌঁছা পর্যন্ত সওয়ার হওয়ার অধিকার রেখে দিলাম। তারপর উট নিয়ে আমি তার কাছে গেলাম। তিনি আমাকে এর নগদ মূল্য দিলেন। তারপর আমি চলে গেলাম। তখন আমার পেছনে লোক পাঠালেন। পরে বললেন, ‘তোমার উট নেওয়ার ইচ্ছা আমার ছিলনা। তোমার এ উট তুমি নিয়ে যাও এটি তোমারই মাল।’
শু’বা (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণণা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটটির পেছনে মদিনা পর্যন্ত আমাকে সওয়ার হতে দিলেন। ইসহাক (রহঃ) জারীর (রহঃ) সূত্রে মুগীরা (রহঃ) থেকে বর্ণণা করেন, আমি সেটি এ শর্তে বিক্রি করলাম যে, মদিনা পৌঁছা পর্যন্ত তার পিঠে সয়ার অধিকার আমার থাকবে। ‘আতা (রহঃ) প্রমুখ বলেন, (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন) মদিনা পর্যন্ত সওয়ার হওয়ার অধিকার তাতে তোমার থাকবে। ইবনু মুনকাদির (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণণা করেন যে, তিনি মদিনা পর্যন্ত এর পিঠে সওয়ার হওয়ার শর্ত করেছেন। যায়দ ইবনু আসলাম (রাঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণণা করেন যে, তোমার প্রত্যাবর্তন করা পর্যন্ত এর পিঠে সওয়ার হতে পারবে। আবূ যুবাইর (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তোমাকে মদিনা পর্যন্ত এর পিঠে সওয়ার হতে দিলাম। আমাশ (রহঃ) সলিম (রহঃ) সূত্রে জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, এর উপর সওয়ার হয়ে তুমি পরিজনের কাছে পৌঁছবে। উবাইদুল্লাহ ও ইবনু ইসহাক (রহঃ) ওয়াহাব (রহঃ) সূত্রে জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণণা করেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক উকিয়ার বিনিময়ে সেটি খরীদ করেছিলেন।
জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণণা করতে গিয়ে যায়দ ইবনু আসলাম (রহঃ) ওয়াহাব (রহঃ) এর অনুসরণ করেছেন। ইবনু জুরাইজ (রহঃ) আতা (রহঃ) প্রমুখ সূত্রে জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণণা করেন যে, (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন) আমি এটাকে বার দিনারের বিনিময়ে নিলাম। দশ দিরহামে এক দিনার হিসাবে তাতে এক উকিয়াই হয়। মুগীরা (রহঃ) শাবী (রহঃ) সূত্রে জাবির (রাঃ) থেকে এবং ইবনু মুনকাদির আবূ যুবাইর (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণণায় মূল্য উল্লেখ করেন নি।
আমশ (রহঃ) সলিম (রহঃ) সূত্রে জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণনায় এক উকিয়া স্বর্ণ উল্লেখ করেছেন। সালিম (রহঃ) জাবির (রাঃ) থেকে আবূ ইসহাকের বর্ণনায় রয়েছে দু’শ দিরহার বিনিময়ে। উবায়দুল্লাহ ইবনু মিকসাম (রহঃ) সূত্রে জাবির (রাঃ) থেকে দাউদ ইবনু কায়স (রহঃ) এর বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি সেটি তাবুকের পথে খরীদ করেন। রাবী বলেন, আমার মনে হয়, তিনি বলেছেন, চার উকিয়ার বিনিময়ে। আবূ নাজরা (রাঃ) জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি সেটি বিশ দীনারে করীদ করেছেন। তবে শাবী (রহঃ) কর্তৃক বর্ণিত, এক উকিয়াই অধিক বর্ণিত। আবূ আবদুল্লাহ (রহঃ) বলেন, (রিওয়ায়াতে বিভিন্ন রকমের হলেও) শর্ত আরোপ কৃত রিওয়ায়াতেই অধিক সূত্রে বর্ণিত এবং আমার মতে এটাই অধিক সহীহ।
২৫৩৬। আবূল ইয়ামান (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আনসারীগণ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললেন ‘আমাদের ও আমাদের (মুহাজির) ভাইদের মধ্যে খেজুর গাছ ভাগ করে দিন।’ তিনি বললেন, না। তখন তাঁরা বললেন, ‘তোমরা আমাদের শ্রমে সাহায্য করবে আর তোমাদের আমরা ফলের অংশ দিব।’ তারা (মুহাজিরগণ) (রাঃ) বললেন, ‘আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম।’
২৫৩৭। মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) ... আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার (এর ভূমি) ইয়াহুদীদেরকে দিলেন এর শর্তে যে, তারা তাতে কাজ করবে এবং তাতে ফসল ফলাবে, তাতে যা উৎপন্ন হবে তারা তার অর্ধেক পাবে।
২৫৩৮। আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) ... উকবা ইবনু আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, শর্তাবলীর মধ্যে যা পূরণ করার অধিক দাবী রাখে তা হল সেই শর্ত যার মাধ্যমে তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের হালাল করেছ।
২৫৩৯। মালিক ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) ... রাফি ইবনু খাদীজ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আনসারদের মধ্যো আমরা অধিক শষ্য ক্ষেতের মালিক ছিলাম। তাই আমরা ক্ষেত বর্গা দিতাম। কখনো এ অংশে ফসল হতো, আর ঐ অংশে ফসল হতো না। তখন তা আমাদের করতে নিষেধ করে দেওয়া হল। কিন্তু অর্থের বিনিময়ে চাষ করতে দিতে নিষেধ করা হয়নি।
২৫৪০। মুসাদ্দাদ (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, শহরবাসী গ্রামবাসীর পক্ষ হয়ে বিক্রয় করবে না। আর তোমরা (দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে) দালালী করবে না। কেউ যেন তার ভাইয়ের ক্রয়ের উপরে দাম না বাড়ায় এবং কেউ যেন তার ভাইয়ের (বিয়ের) প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব না দেয়। আর কোন স্ত্রীলোক যেন তার বোনের (সতীনের) তালাকের চেষ্টা না করে, যেন তার পাত্রের অধিকারী হয়ে যায়।
২৫৪১। কুতাইবা ইবনু সাঈদ (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা ও যায়দ ইবনু খালিদ জুহানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তাঁরা বলেন, এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনাকে আল্লাহর শপথ দিয়ে বলছি, আমার ব্যাপারে আল্লাহর কিতাব মোতাবেক ফয়সালা করুন।’ তখন তার প্রতিপক্ষ, যে তার তুলনায় সমঝদার সে বলল, ‘হ্যাঁ, আপনিা আমাদের মধ্যে আল্লাহর কিতাব মোতাবেক ফয়সালা করুন এবং (আমাকে ঘটনাটি খুলে বলার) অনুমতি দিন।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘বল’। সে বলল, আমার ছেলে এর কাছে মজুর ছিল। সে তার স্ত্রীর সাথে যিনা করেছে। আমাকে বলা হয়েছে যে, আমার ছেলের উপর রাজম প্রযোজ্য। তখন আমি তাকে (ছেলেকে) একশ’ বকরী এবং একটি বাদীর বিনিময়ে তার কাছ থেকে ছাড়িয়ে এনেছি।
পরে আমি আলিমদের জিজ্ঞাসা করলাম। তাঁরা আমাকে জানালেন যে, আমার ছেলের দন্ড হল একশ’ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের নির্বাসন। আর স্ত্রীর দন্ড রজম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম, অবশ্যই আমি তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফয়সালা করব।’ বাদীঁ এবং একশ’ বকরী তোমাকে ফেরত দেওয়া হবে। আর তোমার ছেলের দন্ড একশ’ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের নির্বাসন। হে উনায়স। আগামীকাল সকালে এ লোকের স্ত্রীর কাছে যাবে। যদি সে স্বীকার তাহলে তাকে রাজম করবে। (রাবী বলেন) উনায়স (রাঃ) পরদিন সকালে সে স্ত্রীলোকের কাছে গেলেন। সে যিনার অপরাধ স্বীকার করল্ তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্পর্কে নির্দেশ দিলেন এবং তাকে রাজম করা হল।
২৫৪২। খাল্লাদ ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) ... আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুকাতাবা অবস্থায় বারীরা আমার কাছে এসে বলল, হে উম্মুল মুমিনীন! আপনি আমাকে খরীদ করুন। কারণ আমার মালিক আমাকে বিক্রি করে ফেলবে। তারপর আমাকে আযাদ করে দিন। তিনি বললেন, ‘বেশ, বারীরা বলল, ‘ওয়ালার অধিকার মালিকের থাকবে-এ শর্ত না রেখে তারা আমাকে বিক্রি করবে না।’ তিনি বললেন, তবে তোমাকে দিয়ে আমার প্রয়োজন নেই। পরে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা শুনলেন। কিংবা (রাবীর বর্ণনা) তাঁর কাছে সে সংবাদ পৌছল। তখন তিনি বললেন, বারীরার ব্যাপারে কি? এবং বললেন, তাকে খরীদ কর। তারপর তাকে আযাদ করে দাও। তারা যত ইচ্ছা শর্ত আরোপ করুক। আয়িশা (রাঃ) বলেন, তারপর আমি তাকে খরীদ করলাম এবং আযাদ করে দিলাম। তার মালিক পক্ষ ওয়ালার শর্ত আরোপ করল। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ওয়ালা তারই হবে, যে আযাদ করবে। তারা শত শর্তারোপ করলেও।
২৫৪৩। মুহাম্মদ ইবনু আরআরা (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাউকে শহরের বাউরে গিয়ে বানিজ্যিক কাফেলা থেকে মাল খরীদ করতে নিষেধ করেছেন। আর বেদুঈনের পক্ষ হয়ে মুহাজিরদের বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। আর কোন স্ত্রীলোক যেন তার বোনের (অপর স্ত্রীলোকের) তালাকের শর্তারোপ না করে আর কোন লোক যেন তার ভাইয়ের দামের উপর দাম না করে এবং নিষেধ করেছেন দালালী করতে, (মূল্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে) এবং স্তন্যে দুধ জমা করতে (ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে)। মুআয ও আবদুস সামাদ (রহঃ) শু‘বা (রহঃ) থেকে হাদীস বর্ণনায় মুহাম্মদ ইবনু আরআরা (রহঃ) এর অনুসরণ করেছেন। গুনদার ও আবদুর রহমান (রহঃ) نُهِيَ  বলেছেন এবং আদম (রহঃ) نُهِينَا‏ বলেছেন, আর নাজর ও হাজ্জাজ ইবনু মিনহাল বলেছেন, نَهَى
২৫৪৪। ইবরাহীম ইবনু মূসা (রহঃ) ... উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর রাসূল মূসা (আলাইহিস সালাম) বলেন। তারপর তিনি সম্পূর্ণ ঘটনাটি বর্ণনা করেন। (এ প্রসঙ্গে খিযর (আলাইহিস সালাম) এর এ উক্তিটি উল্লেখ করেন যা তিনি মূসা (আলাইহিস সালাম) কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন), আমি কি বলিনি যে, তুমি আমার সঙ্গে ধৈর্য্য ধারণ করে থাকতে পারবে না? মূসা (আলাইহিস সালাম) এর আপত্তি) প্রথমটি ছিল ভুলবশত, দ্বিতীয়টি শর্ত স্বরূপ, তৃতীয়টি ইচ্ছাকৃত। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি আমার ভুলের কারণে আমার দোষ ধরবেন না এবং আমার ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করবেন না। তাঁরা উভয়ে এক বালকের সাক্ষাত পেলেন এবং খিযর (আলাইহিস সালাম) তাকে হত্যা করলেন। তারপর তাঁরা উভয়ে পথ চলতে লাগলেন। কিছু দূর এগিয়ে তাঁরা পথনোম্মুখ একটি প্রাচীর দেখতে পেলেন। খিযর (আলাইহিস সালাম) প্রাচীরটি সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিলেন। ইবনু আববাস (রাঃ) আয়াতের (وراءهم مالك) এর স্থলে أَمَامَهُمْ مَلِكٌ‏ পড়েছেন।
২৫৪৫। ইসমাঈল (রহঃ) ... আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বারীরা আমার কাছে এসে বলল, আমি আমার মালিকের সঙ্গে নয় উকিয়ার বিনিময়ে আমাকে আযাদ করার এক চুক্তি করেছি। প্রতি বছর এক উকিয়া করে পরিশোধ করতে হবে। তাই আপনি আমাকে সাহায্য করুন। আয়িশা (রাঃ) বললেন, তারা যদি এ শর্তে রাযী হয় যে, আমি তাদের সমস্ত প্রাপ্য এক সাথে দিয়ে দেই এবং তোমার ওয়ালা আমার জন্য থাকবে, তাহলে আমি তা করব। বারীরা তার মালিকের কাছে গিয়ে তাদের এ কথা বলল; কিন্তু তারা তা অস্বীকার করল। তারপর বরীরা তাদের কাছ থেকে ফিরে আসল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসা ছিলেন। বারীরা বলল, আমি তাদের কাছে প্রস্তাবটি পেশ করেছি, ওয়ালার অধিকার তাদের জন্য না হলে, এতে তারা অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুনলেন এবং আয়িশা (রাঃ)-ও তাকে অবহিত করলেন। তারপর তিনি বললেন, তুমি বারীরাকে নিয়ে নাও এবং তাদের জন্য ওয়ালার অধিকারের শর্ত মেনে নাও। কেননা ওয়ালা অধিকার তো তারই যে আযাদ করবে। আয়িশা (রাঃ) তাই করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের মাঝে দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা ও সানা বর্ণনা করে বললেন, ‘লোকদের কি হল যে, তারা এমন সব শর্ত আরোপ করে যা আল্লাহর কিতাবে নেই? আল্লাহর কিতাবের বহির্ভুত যে কোন শর্ত বাতিল, যদিও শত শর্তারোপ করা হয়। আল্লাহর ফয়সালা যথার্থ ও তাঁর শর্ত সুদৃঢ়। ওয়ালা তো তারই যে আযাদ করে।
২৫৪৬। আবূ আহমদ (রহঃ) ... ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন খায়বারবাসীরা আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) এর হাত, পা ভেঙ্গে দিল, তখন উমর (রাঃ) ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন এবং বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বারের ইয়াহুদীদের সাথে তাদের বিষয় সম্পত্তি সম্পর্কে চুক্তি করেছিলেন এবং বলেছিলেন, আল্লাহ তাআলা যতদিন তোমাদের রাখেন, ততদিন আমরাও তোমাদের রাখব। এমতাবস্থায় আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) তাঁর নিজ সম্পত্তি দেখাশোনা করার জন্য খায়বার গমন করলে এক রাতে তাঁর উপর আক্রমন করা হয় এবং তাঁর দুটি হাত পা ভেঙ্গে দেওয়া হয়। সেখানে ইয়াহুদীরা ছাড়া আর কোন শত্রু নেই। তারাই আমাদের দুশমন। তাদের উপর আমাদের সন্দেহ। অতএব আমি তাদের নির্বাসিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। উমর (রাঃ) যখন এ ব্যাপারে তাঁর দৃঢ় মত প্রকাশ করলেন, তখন আবূ হুকায়ক গোত্রের এক ব্যাক্তি এসে বলল, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি কি আমাদের খায়বার থেকে বহিস্কার করবেন? অথচ মুহাম্মদ আমাদেরকে এখানে অবস্থানের অনুমতি দিয়েছিলেন। আর উক্ত সম্পত্তির ব্যাপারে আমাদের সাথে বর্গাচাষের ব্যবস্থা করেন এবং আমাদের এ শর্তে দেন।’
উমর (রাঃ) বলেন, ‘তুমি কি মনে করেছ যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সে উক্তি ভুলে গিয়েছি, তোমার কি অবস্থা হবে, যখন তোমাকে খায়বার থেকে বের করে দেয়া হবে এবং তোমার উটগুলো রাতের পর রাত তোমাকে নিয়ে ছুটবে।’ সে বলল, ‘এ উক্তি তো আবূল কাসিম এর পক্ষ থেকে বিদ্রুপ স্বরূপ ছিল।’ উমর (রাঃ) বললেন, ‘হে আল্লাহর দুশমন! তুমি মিথ্যা বলছ।’ তারপর উমর (রাঃ) তাদের নির্বাসিত করেন এবং তাদের ফসলাদি, মালপত্র, উট, লাগাম রশি ইত্যাদি সামগ্রীর মূল্য দিয়ে দেন।
রিওয়ায়াতটি হাম্মদ ইবনু সালামা (রহঃ) ... উমর (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করেন।
২৫৪৭। আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) ... মিসওয়ার ইবনু মাখরামা (রাঃ) ও মারওয়ান (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তাদের উভয়ের একজনের বর্ণনা অপরজনের বর্ণনার সমর্থন করে তারা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদায়বিয়ার সময় বের হলেন। যখন সাহাবীগন রাস্তার এক জায়গায় এসে পৌঁছলেন, তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘খালিদ ইবনু ওয়ালিদ কুরাইশদের অশ্বারোহী অগ্রগামী বাহিনী নিয়ে গোমায়ম নামক স্থানে অবস্থান করছে। তোমরা ডান দিকে চল’ আল্লাহর কসম! খালিদ মুসলমানদের উপস্থিতি টেরও পেলো না, এমনকি যখন তারা মুসলিম সেনাবাহিনীর পশ্চাতে ধূলিরাশি দেখতে পেল, তখন সে কুরাইশদের সংবাদ দেওয়ার জন্য ঘোড়া দৌড়িয়ে চলে গেল।
এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অগ্রসর হয়ে যখন সেই গিরিপথে পৌঁছলেন, যেখান থেকে মক্কার সোজা পথ চলে গিয়েছে, তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উটনী বসে পড়ল। লোকজন তাকে (উঠাবার জন্য) ‘হাল-হাল’ বলল, কাসওয়া ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, কাসওয়া ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘কাসওয়া ক্লান্ত হয়নি এবং তা তার স্বভাবও নয় বরং তাকে তিনই আটকিয়েছেন যিনি হাতি বাহিনীকে আটকিয়েছিলেন।’ তারপর তিনি বললেন, ‘সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ‘ কুরাইশরা আল্লাহর সম্মানিত বিষয় সমূহের মধ্যে যে কোন বিষয়ের সম্মান প্রদর্শনার্থে কিছু চাইলে আমি তা পূরণ করব।’
এরপর তিনি তাঁর উষ্ট্রীকে ধমক দিলে সে উঠে দাঁড়াল। রাবী বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের পথ ত্যাগ করে হুদায়বিয়ার শেষ প্রান্তে অল্প পানি বিশিষ্ট কূপের কাছে অবতরণ করেন। লোকজন তা থেকে অল্প-অল্প পানি নিচ্ছিল। এভাবে কিছুক্ষনের মধ্যেই লোকজন পানি শেষ করে ফেলল এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পিপাসার অভিযোগ করা হল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোষ থেকে একটি তীর বের করলেন এবং সেই তীরটি সেই কূপে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন। আল্লাহর কসম! তখন পানি উপচে উঠতে লাগল, এমনকি সকলেই তৃপ্তি সহকারে পানি পান করলেন।
এমন সময় বুদায়ল ইবনু ওয়ারকা খুযাঈ তার খুযাআ গোত্রের কিছু লোক নিয়ে এলো। তারা তিহামাবাসীদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আন্তরিক হিতাকাঙ্খি ছিল। বুদাইল বলল, আমি কাব ইবনু লুওহাই ও আমির ইবনু লুওহাইকে রেখে এসেছি। তারা হুদায়বিয়ার প্রচুর পানির নিকট অবস্থান করছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে সাবকসহ দুগ্ধবতী অনেক উষ্ট্রী। তারা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ও বায়তুল্লাহ যিয়ারতে বাধা প্রদান করতে প্রস্তুত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আমি তো কারো সঙ্গে যুদ্ধ করতে আসিনি; বরং উমরা করতে এসেছি। যুদ্ধ নিঃসন্দেহে কুরাইশদের দূর্বল করে ফেলেছে, ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা যদি চায়, তবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের সঙ্গে সন্ধি করতে পারি আর তারা আমার ও কাফিরদের মধ্যকার বাধা তুলে নিবে।
যদি আমি তাদের উপর জয়ী হয় তবে অন্যান্য লোক ইসলামে যেভাবে প্রবেশ করেছে, তারাও চাইলে তা করতে পারবে। আর না হয়, তারা এসময়টুকুতে শান্তিতে থাকবে। কিন্তু তারা যদি আমার প্রস্তাব অস্বীকার করে, তা হলে সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আমার গর্দান বিচ্ছিন্ন না হওয়া পর্যন্ত আমরা এ ব্যাপারে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাব। আর নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাঁর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করবেন।’ বুদায়ল বলল, ‘আমি আপনার বক্তব্য তাদের কাছে পৌঁছিয়ে দিব।
এরপর বুদায়ল কুরাইশদের কাছে এসে বলল, ‘তাঁর পক্ষ থেকে আমাদের কাছে তোমার কিছু বলার প্রয়োজন মনে করি না। কিন্তু তাদের বিবেকবান লোকেরা বলল, ‘তুমি তাঁকে যা বলতে শুনেছ, আমাদেরকে তা বল।’ তারপর বুদায়ল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছিলেন, সব তাদের শোনাল। তারপর উরওয়া ইবনু মাসউদ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘হে লোকেরা! আমি কি তোমাদের পিতৃতুল্য নই? তারা বলল, ‘হ্যাঁ নিশ্চয়ই। ’ উরওয়া বলল, ‘তোমরা কি আমার সন্তান তুল্য নও?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ অবশ্যই। ’ উরওয়া বলল, আমার সম্বন্ধে তোমাদের কি কোন অভিয়োগ আছে? তারা বলল, না। উরওয়া বলল, তোমরা কি জানো না যে, আমি তোমদের সাহায্যের জন্য উকাযবাসীদের কাছে আবেদন করেছিলাম এবং তারা আমাদের আহবানে সাড়া দিতে অস্বীকার করলে আমি আমার আত্মীয়-স্বজন, সন্তান-সন্তুতি ও আমার অনুগতদের নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছিলাম? তারা বলল, হ্যাঁ, জানি।
উরওয়া বলল, এই লোকটি তোমাদের কাছে একটি ভাল প্রস্তাব পেশ করেছেন। তোমরা তা মেনে নাও এবং আমাকে তাঁর কাছে যেতে দাও। তারা বলল, আপনি তাঁর কাছে যান। তারপর উরওয়া নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এল এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সঙ্গে কথা বললেন, যেমনিভাবে বুদায়লের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। উরওয়া তখন বলল, হে মুহাম্মদ, আপনি কি চান যে, আপনার কওমকে নিশ্চিহৃ করে দিবেন, আপনি আপনার পূর্বের আরববাসীদের এমন কারো কথা শুনেছেন যে, সে নিজ কওমের মুলোৎপাটন করতে উদ্যত হয়েছিল? আর যদি অন্য রকম হয়, (তখন আপনার কি অবস্থা হবে?) আল্লাহর কসম! আমি কিছু চেহারা দেখছি এবং বিভিন্ন ধরণের লোক দেখতে পাচ্ছি যাঁরা পালিয়ে যাবে এবং আপনাকে পরিত্যাগ করবে।
তখন আবূ বকর (রাঃ) তাকে বললেন, তুমি লাত দেবীর লজ্জাস্থান চেটে খাও। আমরা কি তাঁকে ছেড়ে পালিয়ে যাব? উরওয়া বলল, সে কে? লোকজন বললেন, আবূ বকর। উরওয়া বললেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আমি তাঁর কসম করে বলছি, আমার উপর যদি আপনার ইহসান না থাকত, যার প্রতিদান আমি দিতে পারিনি, তাহলে নিশ্চই আপনার কথার জবাব দিতাম। রাবী বললেন, উরওয়া পুনরায় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাঁড়িতে হাত দিত। তখন মুগীরা ইবনু শুবা (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শিয়রে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং তাঁর সাথে ছির একটি তরবারী ও মাথায় ছিল লৌহ শিরস্ত্রা। উরওয়া যখনই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাঁড়ির দিকে তার হাত বাড়াতো মুগীরা (রাঃ) তাঁর তরবারীর হাতল দিয়ে তার হাতে আঘাত করতেন এবং বলতেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাঁড়ি থেকে তোমার হাত হটাও।
উরওয়া মাথা তুলে বলল, এ কে? লোকজন বললেন, মুগীরা ইবনু শুবা। উরওয়া বলল, হে গাদ্দার! আমি কি তোমার গাদ্দারীর পরিণতি থেকে তোমাকে উদ্ধারের চেষ্টা করিনি? মুগীরা (রাঃ) জাহেলী যুগে কিছু লোকদের সাথে ছিলেন। একদিন তাদের হত্যা করে তাদের সহায় সম্পদ ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। তারপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমার ইসলাম মেনে নিলাম, কিন্তু যে মাল তুমি নিয়েছ, তার সাথে আমার কোন সর্ম্পক নেই। তারপর উরওয়া চোখের কোন দিয়ে সাহাবীদের দিকে তাকাতে লাগল। সে বলল, আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো থুথু ফেললে তা সাহাবীদের হাতে পড়তো এবং তা গায়ে মুখে মেখে ফেলতেন। তিনি তাঁদের কোন আদেশ দিলে তা তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে পালন করতেন। তিনি উযূ (ওজু/অজু/অযু) করলে তাঁর উযূ (ওজু/অজু/অযু)র পানির জন্য তাঁর সাহাবীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হতো। তিনি যখন কথা বলতেন, তখন নিরবে তা শুনতেন এবং তাঁর সম্মানার্থে সাহাবীগন তাঁর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাতেন না।
তারপর উরওয়া তার সঙ্গীদের কাছে ফিরে গেল এবং বলল, হে আমার কওম, আল্লাহর কসম! আমি অনেক রাজা বাদশাহর নিকটে প্রতিনিধিত্ব করেছি। কায়সার (রোম) কিসরা (পারস্য) ও নাজ্জাশী (আবিসিনিয়ার) সম্রাটের নিকটে দূত হিসেবে গিয়েছি; কিন্তু আমি আল্লাহর কসম করে বলতে পারি যে, কোন রাজা বাদশাহকেই তার অনুসরীদের ন্যায় এত সম্মান করতে দেখিনি, যেমন মুহাম্মদের অনুসারীরা তাঁকে করে থাকে। আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি থুথু ফেলেন, তখন তা কোন সাহাবীর হাতে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা তা তাদের গায়ে মুখে মেখে ফেলেন। তিনি কোন আদেশ দিলে তারা তা সঙ্গে সঙ্গে পালন করেন; তিনি ওযু করলে তাঁর ওযুর পানি নিয়ে সাহাবীগণের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়; তিনি কথা বললে, সাহাবীগণ নিশ্চুপ হয়ে শুনেন। এমনকি তাঁর সমামানার্থে তারা তাঁর চেহারার দিকেও তাকান না। তিনি তোমাদের কাছে একটি ভালো প্রস্তাব পাঠিয়েছেন, তোমরা তা মেনে নাও।
তা শুনে কিনানা গোত্রের এক ব্যাক্তি বলল, আমাকে তাঁর নিকট যেতে দাও। লোকেরা বলল, যাও। সে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণের কাছে এল তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ হল অমুক ব্যাক্তি এবং এমন গোত্রের লোক, যারা কুরবানীর পশুকে সম্মান করে থাকে। তোমরা তার কাছে কুরবাণীর পশু নিয়ে আস। তারপর তার কাছে তা নিয়ে আসা হল এবং লোকজন তালবিয়া পাঠ করতে করতে তার সামনে এলেন। তা দেখে লোকটি বলল, সুবাহান্নাল্লাহ! এমন সব লোকদেরকে কাবা যিয়ারত থেকে বাধা দেওয়া সঙ্গত নয়। তারপর সে তার সঙ্গীদের কাছে ফিরে গিয়ে বলল, আমি কুরবাণরি পশু দেখে এসেছি, সেগুলোকে কিলাদা পরানো হয়েছে ও চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই তাদের কাবা যিয়ারত বাধা প্রদান সঙ্গত মনে করি না।
তখন তাদের মধ্যে থেকে মিকরায ইবনু হাকস নামক এক ব্যাক্তি দাঁড়িয়ে বলল, আমাকে তাঁর কাছে যেতে দাও। তারা বলল, তাঁর কাছে যাও। তারপর সে যখন মুসলিমদের নিকটবর্তী হল, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমাদের জন্য তোমাদের কাজ সহজ হয়ে গেল।’ মা’মার (রহঃ) বলেন, যুহরী (রহঃ) তার বর্ণিত হাদীসে বলেছেন যে, সুহায়ল ইবনু আমর এসে বলল, আসুন আমাদের অ আপনাদের মধ্যে একটি চুক্তিপত্র লিখি। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন লেখককে ডাকলেন। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (লিখ) بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ এতে সুহায়ল বলল, আল্লাহর কসম! রাহমান কে? আমরা তা জানি না, বরং পূর্বে আপনি যেমন লিখতেন, লিখুন بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ‏
মুসলিমগন বললেন, আল্লাহর কসম! আমরা بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ‏ ছাড়া আর কিছু লিখব না। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, লিখ, بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ তারপর বললেন, এটা যার উপর চুক্তিবদ্ধ হয়েছে আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন সুহায়ল বলল, আল্লাহর কসম! আমরা যদি আপনাকে আল্লাহর রাসূল বলেই বিশ্বাস করতাম, তাহলে আপনাকে কাবা যিয়ারত দেখে বাধা দিতাম না এবং আপনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে উদ্যত হতাম না। বরং আপনি লিখুন, আবদুল্লাহ পুত্র মুহাম্মদ (এর তরফ থেকে)। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘নিশ্চুই আমি আল্লাহর রাসূল কিন্তু তোমরা যদি আমাকে অস্বীকার কর তবে লিখ, আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ।’
যুহরী (রহঃ) বলেন, এটি এ জন্য যে, তিনি বলেছিলেন, তারা যদি আল্লাহর পবিত্র বস্তুগুলোর সম্মান করার কোন কথা দাবী করে তাহলে আমি তাদের সে দাবী মেনে নিব। তারপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ চুক্তি কর যে, তারা আমাদের ও কাবা শরীফের মধ্যে কোন প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে না, যাতে আমরা (নির্বিঘ্নে) তাওয়াফ করতে পারি। সুহায়ল বলল, আল্লাহর কসম! আরববাসীরা যেন এ কথা বলার সুযোগ না পায় যে, এ প্রস্তাব গ্রহণে আমাদের বাধ্য করা হয়েছে। বরং আগামী বছর তা হতে পারে। তারপর লেখা হল। সুহায়ল বলল, এ-ও লিখা হোক যে, আমাদের কোন লোক যদি আপনার কাছে চলে আসে এবং সে যদিও আপনার দ্বীন গ্রহণ করে থাকে, তবুও তাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিবেন। মুসলিমগণ বললেন, সুবাহান্নাল্লাহ! যে ইসলাম গ্রহন করে আমাদের কাছে এসেছে, তাকে কেমন করে মুশরিকদের কাছে ফেরত দেওয়া যেতে পারে?
এমন সময় আবূ জানদাল ইবনু সুহায়ল ইবনু আমর সেখানে এসে উপস্থি হলেন। তিনি বেড়ী পরিহিত অবস্থায় ধীরে ধীরে চলছিলেন। তিনি মক্কার নিম্নাঞ্চল থেকে বের হয়ে এসে মুসলিমদের সামনে নিজেকে পেশ করলেন। সুহায়ল বলল, হে মুহাম্মদ! আপনার সাথে আমার চুক্তি হয়েছে, সে অনুযায়ী প্রথম কাজ হল তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এখনো তো চুক্তি সম্পাদিত হয়নি। সুহায়ল বলল, আল্লাহর কসম! তাহলে আমি আপনাদের সঙ্গে আর কখনো সন্ধি করব না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কেবল এ লোকটিকে আমার কাছে থাকার অনুমতি দাও। সে বলল, না। এ অনুমতি আমি দেবো না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, তুমি এটা কর। সে বলল, আমি তা করব না।
মিকরায বলল, আমরা তাকে আপনার কাছে থাকার অনুমতি দিলাম। আবূ জানদাল বলেন, হে মুসলিম সমাজ, আমাকে মুশরিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে, অথচ আমি মুসলিম হয়ে এসেছি। আপনার কি দেখছেন না, আমি কত কষ্ট পাচ্ছি। আল্লাহর রাস্তায় তাকে অনেক নির্যাতিত করা হয়েছে। উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলাম এবং বললাম, আপনি কি আল্লাহর সত্য নাবী নন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, আমরা কি হকের উপর নই আর আমাদের দুশমনরা কি বাতিলের উপর নন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, তাহলে দ্বীনের ব্যাপারে কেন আমরা হেয় হবো?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললাম, ‘আমি অবশ্যই রাসূল অতএব আমি তার অবাধ্য হতে পারি না, অথচ তিনই আমার সাহায্যকারী। আমি বললাম, আপনি কি আমাদের বলেন নাই যে, আমরা শীঘ্রই বায়তুল্লাহ যাব এবং তাওয়াফ করব। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি কি এ বছরই আসার কথা বলেছি? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তুমি অবশ্যই কাবা গৃহে যাবে এবং তাওয়াফ করবে। উমর (রাঃ) বলেন, তারপর আমি আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে গিয়ে বললাম, হে আবূ বকর। তিনি কি আল্লাহর সত্য নাবী নন? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ‘অবশ্যই।’ আমি বললাম, আমরা কি সত্যের উপর নই এবং আমাদের দুশমনরা কি বাতিলের উপর নয়? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, নিশ্চই। আমি বললাম, তবে কেন আমরা এখন আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে এত হীনতা স্বীকার করব?
আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ‘ওহে’ নিশ্চই তিনি আল্লাহর রাসূল এবং তিনি তাঁর রবের নাফরমানী করতে পারেন না। তিনই তাঁর সাহায্যকারী। তুমি তাঁর অনুসরণকে আকড়ে ধরো। আল্লাহর কসম! তিনি সত্যের উপর আছেন। আমি বললাম, তিনি কি বলেননি যে, আমরা অচিরেই বায়তুল্লাহ যাব এবং তার তাওয়াফ করব। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, অবশ্যই। কিন্তু তুমি এবারই যে যাবে তিনি এ কথা কি বলেছিলেন? আমি বললাম, না। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, তবে নিশ্চই তুমি সেখানে যাবে এবং তার তাওয়াফ করবে।
যুহরী (রহঃ) বলেন যে, উমর (রাঃ) বলেছিলেন, আমি এর জন্য (অর্থাৎ ধৈর্যহীনতার কাফফারা হিসাবে) অনেক নেক আমল করেছি। বর্ণনাকারী বলেন, সন্ধিপত্র লেখা শেষ হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদেরকে বললেন, তোমরা উঠ এবং কুরবানী কর ও মাথা কামিয়ে ফেল। রাবী বলেন, আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা তিনবার বলার পরও কেউ উঠলেন না। তাদের কাউকে উঠতে না দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সালামা (রাঃ)-এর কাছে এসে লোকদের এ আচরণের কথা বলেন। উম্মে সালামা (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর নাবী! আপনি যদি তাই চান, তাহলে আপনি বাইরে যান ও তাদের সাথে কোন কথা না বলে আপনার উট আপনি কুরবানী করুন এবং ক্ষুরকার ডেকে মাথা মুড়িয়ে নিন।
সেই অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেরিয়ে গেলেন এবং কারো সাথে কোন কথা না বলে নিজের পশু কুরবানী দিলেন এবং ক্ষুরকার ডেকে মাথা মুড়িয়ে নিলেন। তা দেখে সাহাবীগণ উঠে দাঁড়ালেন ও নিজ নিজ পশু কুরবানী দিলেন এবং একে অপরের মাথা কামিয়ে দিলেন। অবস্থা এমন হল যে, ভীড়ের কারণে একে অপরের উপর পড়তে লাগলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে কয়েকজন মুসলিম মহিলা এলেন। তখন আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেনঃ ‏يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا جَاءَكُمُ الْمُؤْمِنَاتُ مُهَاجِرَاتٍ فَامْتَحِنُوهُنَّ হে মুমিনগণ! মুমিন মহিলারা তোমাদের কাছে হিযরত করে আসলে, ...... কাফির নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখো না। (৬ঃ ১০)
সেদিন উমর (রাঃ) দু'জন স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিলেন, তারা ছিলেন মুশরিক থাকাকালে তার স্ত্রী। তাদের একজনকে মুআবিয়া ইবনু আবূ সুফিয়অন এবং অপরজনকে সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া বিয়ে করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় ফিরে আসলেন। তখন আবূ বাসীর (রাঃ) নামক কুরাইশ গোত্রের এক ব্যাক্তি ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলেন। মক্কার কুরাইশরা তাঁর তালাশে দু‘জন লোক পাঠাল। তারা (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে) বলল, আপনি আমাদের সাথে যে চুক্তি করেছেন (তা পূর্ণ করুন)। তিনি তাকে ঐ দুই ব্যাক্তির হাওয়ালা করে দিলেন। তাঁরা তাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল এবং যুল-হুলায়ফায় পৌছে অবতরণ করল আর তাদের সাথে যে খেজুর ছিল তা খেতে লাগল।
আবূ বাসীর (রাঃ) তাদের একজনকে বললেন, আল্লাহর কসম! হে অমুক, তোমার তরবারীটি খুবই চমৎকার দেখছি। সে লোকটি তরবারীটি বের করে বলল, হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! এটি একটি উৎকৃষ্ট তরবারী। আমি একাধিক বার তা পরীক্ষা করেছি। আবূ বাসীর (রাঃ) বললেন, তলোয়ারটি আমি দেখতে চাই তা আমাকে দেখাও। তারপর লোকটি আবূ বাসীরকে তলোয়ারটি দিল। আবূ বাসীর সেটি দ্বারা তাকে এমন আঘাত করলেন যে, তাতে সে মরে গেল। তার অপর সঙ্গী পালিয়ে মদিনায় এসে পৌছল এবং দাঁড়িয়ে মসজিদে প্রবেশ করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখে বললেন, এই লোকটি ভীতিজনক কিছু দেখে এসেছে।
ইতিমধ্যে লোকটি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে পৌছে বলল, আল্লাহর কসম! আমার সঙ্গীকে হত্যা করা হয়েছে, আমিও নিহত হতাম। এমন সময় আবূ বাসীর (রাঃ)-ও সেখানে এসে উপস্থিত হলেন এবং বললেন, ইয়া নাবীয়াল্লাহ! আল্লাহর কসম! আল্লাহ আপনার দায়িত্ব সম্পূর্ণ করে দিয়েছেন। আমাকে তার কাছে ফেরত দিয়েছেন; এ ব্যাপা আল্লাহ আমাকে তাদের কবল থেকে নাজাত দিয়েছেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সর্বনাশ! এতো যুদ্ধের আগুন প্রজ্জলিতকারী, কেউ যদি তাকে বিরত রাখত। আবূ বাসীর (রাঃ) যখন এ কথা শুনলেন, তখন বুঝতে পারলেন যে, তাকে তিনি আবার কাফিরদের কাছে ফেরত পাঠাবেন। তাই তিনি বেরিয়ে নদীর তীরে এসে পড়লেন।
রাবী বলেন, এ দিকে আবূ জানদাল ইবনু সুহায়ল কাফিরদের কবল থেকে পালিয়ে এসে আবূ বাসীরের সঙ্গে মিলিত হলেন। এরপর থেকে কুরাইশ গোত্রের যে-ই ইসলাম গ্রহণ করত, সে-ই আবূ বাসীরের সঙ্গে এসে মিলিত হতো। এভাবে তাদের একটি দল হয়ে গেল। আল্লাহর কসম! তারা যখনই শুনতেন যে, কুরাইশদের কোন বানিজ্য কাফিলা সিরিয়া যাবে, তখনই তারা তাদের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতেন আর তাদের হত্যা করতেন ও তাদের মাল সামান কেড়ে নিতেন্ তখন কুরাইশরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে লোক পাঠাল। আল্লাহ ও আত্মীয়তার ওয়াসীলা দিয়ে আবেদন করল যে, আপনি আবূ বাসীরের কাছে এর থেকে বিরত থাকার জন্য নির্দেশ পাঠান। এখন থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে) কেউ এলে সে নিরাপদ থাকবে (কুরাইশদের কাছে ফেরত পাঠাতে হবে না)।
তারপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে নির্দেশ পাঠালেন। এ সময় আল্লাহ তাআলা নাযিল করেনঃ وَهُوَ الَّذِي كَفَّ أَيْدِيَهُمْ عَنْكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ عَنْهُمْ بِبَطْنِ مَكَّةَ مِنْ بَعْدِ أَنْ أَظْفَرَكُمْ عَلَيْهِمْ থেকে ‏الْحَمِيَّةَ حَمِيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ পর্যন্ত। অর্থঃ তিনি তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে বিরত রেখেছেন ...... জাহেলী যুগের অহমিকা পর্যন্ত ৪৮ঃ ২৬। তাদের অহমিকা এই ছিল যে, তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আল্লাহর নাবী বলে স্বীকার করেনি এবং মেনে নেইনি; বায়তুল্লাহ ও মুসলিমদের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল।
উকাইল (রহঃ) যুহরী (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, উরওয়া (রহঃ) বলেন যে, আমার কাছে আয়িশা (রাঃ) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম মহিলাদের পরীক্ষা করতেন এবং আমাদের কাছে এ বর্ণনা পৌছেছে যে, যখন আল্লাহ তাআলা নাযিল করেন, মুসলমানগণ যেন মুশরিক স্বামীদের সে সব খরচ আদায় করে দেয়, যা তারা তাদের হিযরতকারী স্ত্রীদের জন্য ব্যয় করেছে এবং মুসলিমদের নির্দেশ দেন যেন তারা কাফির স্ত্রীদের আটকিয়ে না রাখে। তখন উমর (রাঃ) তাঁর দুই স্ত্রী কুরায়বা বিনতে আবূ উমায়্যা ও বিনতে জারওয়াল খুযায়ীকে তালাক দিয়ে দেন। এরপর কুরায়বাকে মুআবিয়া ও অপর জনকে আবূ জাহাম বিয়ে করে নেয়। তারপর কাফিররা যখন মুসলমানদের তাদের স্ত্রীদের জন্য খরচকৃত অর্থ ফেরত দিতে অস্বীকার করল, তখন নাযিল হলঃ وَإِنْ فَاتَكُمْ شَىْءٌ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ إِلَى الْكُفَّارِ فَعَاقَبْتُمْ‏ তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যদি কেউ হাত ছাড়া হয়ে কাফিরদের কাছে চলে যায়, তবে তার বদলা নিবে। ৬০ঃ ১১ বদলা হলঃ কাফিরদের স্ত্রী যারা হিযরত করে চলোসে, তাদের কাফির স্বামীকে মাহর মুসলিমদের যা দিতে হয়, এ সমন্ধে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দেন যে, তারা যেন মুসলিমদের যে সব স্ত্রী চলে গেছে ঐ অর্থ তাদের স্বামীদেরকে দিয়ে দেয়।
(যুহরী (রহঃ) আরো বলেন) এমন কোন মুহাজির রমনীর কথা আমাদের জানা নেই, যে ঈমান আনার পর মুরতাদ হয়ে চলে গেছে। আমাদের কাছে এ বর্ণণা পৌছেছে যে, আবূ বাসীর ইবনু আসীদ সাকাফী (রাঃ) ঈমান এনে চুক্তির মিয়াদের মধ্যে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে হিজরত করে চলে আসলেন। তখন আখনাস ইবনু শারীক আবূ বাসীর (রাঃ) কে ফেরত চেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পত্র লিখল। তারপর তিনি হাদীসের অবশিষ্ট অংশ বর্ণনা করেছেন।
২৫৪৮। আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) ... আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বারীরা তার কিতাবতের ব্যাপারে তাঁর কাছে সাহায্যের আবেদন নিয়ে এল। তিনি বললেন, তুমি চাইলে আমি (কিতাবতের সমুদয় প্রাপ্য) তোমার মালিককে দিয়ে দিতে পারি এবং ওয়ালার অধিকার হবে আমার। তারপর যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন, তিনি তাঁর কাছে বিষয়টি উল্লেখ করেন। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তাকে কিনে আযাদ করে দাও। কেননা, ওয়ালার অধিকার তারই, যে আযাদ করে। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘লোকদের কি হয়েছে যে, তারা এমন সব শর্ত আরোপ করে যা আল্লাহর কিতাবে নেই! যে এমন শর্ত আরোপ করে যা আল্লাহর কিতাবে নেই, সে তার অধিকারী হবে না যদিও শত শর্ত আরোপ করে।’
২৫৪৯। আবূল ইয়ামান (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর নিরান্নববই অর্থাৎ এক কম একশটি নাম রয়েছে, যে ব্যাক্তি তা স্মরণ রাখবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
২৫৫০। কুতাইবা ইবনু সাইদ (রহঃ) ... ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) খায়বারে কিছু জমি লাভ করেন। তিনি এ জমির ব্যাপারে পরামর্শের জন্য রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলেন এবং বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি খায়বারে এমন উৎকৃষ্ট কিছু জমি লাভ করেছি যা ইতিপূর্বে আর কখনো পাইনি। আপনি আমাকে এ ব্যাপারে কি আদেশ দেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি ইচ্ছা করলে জমির মূলসত্ত্ব ওয়াকফে আবদ্ধ করতে এবং উৎপন্ন বস্তু সাদকা করতে পার।’ ইবনু উমর (রাঃ) বলেন, ‘উমর (রাঃ) এ শর্তে তা সাদকা (ওয়াকফ) করেন যে, তা বিক্রি করা যাবে না, তা দান করা যবে না এবং কেউ এর উত্তরাধীকারী হবে না। তিনি সাদকা করে দেন এর উৎপন্ন বস্তু অভাবগ্রস্ত, আত্মীয়-স্বজন, দাসমুক্তি, আল্লাহর রাস্তায়, মূসাফির মেহমানদের জন্য। (রাবী আরো বলেন) যে এর মুতাওয়াল্লী হবে তার জন্য সম্পদ সঞ্চয় না করে যথাবিহীত খওয়ানোতে কোন দোষ নেই। তারপর আমি ইবনু সীরিন (রহঃ) এর নিকট হাদীসটি বর্ণনা করলে তিনি বলেন, অর্থাৎ মাল জমা না করে।

সহীহ বুখারী,৫ম খন্ড, অধ্যায়-৪৫, বিষয়ঃ-সন্ধি ।

হাদীস নং-২৫১১। সাঈদ ইবনু আবূ মারয়াম (রহঃ) ... সাহল ইবনু সা‘দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, আমর ইবনু আওফ গোত্রের কিছু লোকের মধ্যে সামান্য বিবাদ ছিল। তাই নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীগণের একটি জামায়াত নিয়ে তাদের মধ্যে আপস-মিমাংশা করে দেওয়ার জন্য সেখানে গেলেন। এদিকে সালাত (নামায/নামাজ)-এর সময় হয়ে গেল। কিন্তু নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববীতে এসে পৌছেন নি। বিলাল (রাঃ) সালাত (নামায/নামাজ)-এর আযান দিলেন, কিন্তু নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনও এসে পৌঁছেন নি। পরে বিলাল (রাঃ) আবূ বকর (রাঃ)-এর কাছে এসে বললেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাজে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এদিকে সালাত (নামায/নামাজ)-এরও সময় হয়ে গেছে। আপনি সালাত (নামায/নামাজ) লোকদের ইমামতি করবেন? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, তুমি যদি ইচ্ছা কর।'
তারপর বিলাল (রাঃ) সালাত (নামায/নামাজ)-এর ইকামত বললেন, আর আবূ বকর (রাঃ) এগিয়ে গেলেন। পরে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন এবং কাতারগুলো অতিক্রম করে প্রথম কাতারে এসে দাঁড়ালেন। (তা দেখে) লোকেরা হাততালি দিতে শুরু করল এবং তা অধিক মাত্রায় দিতে লাগলেন। আবূ বকর (রাঃ) সালাত (নামায/নামাজ) অবস্থায় কোন দিকে তাকাতেন না, কিন্তু (হাততালির কারণে) তিনি তাকিয়ে দেখতে পেলেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পেছনে দাঁড়িয়েছেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে হাতের ইশারায় আগের ন্যায় সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতে নির্দেশ দিলেন। আবূ বকর (রাঃ) তাঁর দু’হাত উপরে তুলে আল্লাহর হামদ বর্ণনা করলেন। তারপর কিবলার দিকে মুখ রেকে পেছনে ফিরে এসে কাতারে শামির হলেন।
তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগে বেড়ে লোকদের ইমামত করলেন এবং সালাত (নামায/নামাজ) সমাপ্ত করে লোকদের দিকে ফিরে বললেন, ‘হে লোক সকল! সালাত (নামায/নামাজ) অবস্থায় তোমাদের কিছু ঘটলে তোমরা হাততালি দিতে শুরু কর। অথচ হাততালি দেওয়া মহিলাদের কাজ। সালাত (নামায/নামাজ) অবস্থায় কারো কিছু ঘটলে সে যেন সুবাহান্নাল্লাহ বলে। কেননা এটা শুনলে তার দিকে দৃষ্টিপাত না করে পারতো না। ‘হে আবূ বকর! তোমাকে যখন ইশারা করলাম, তখন সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করাতে তোমার কিসের বাধা ছিল?’ তিনি বললেন, ‘আবূ কূহাফার পুত্রের জন্য শোভা পায় না নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে ইমামত করা।
হাদীস নং-২৫১২। মুসাদ্দাদ (রহঃ) ... আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলা হল, আপনি যদি আবদুল্লাহ ইবনু উবাইয়ের কাছে একটু যেতেন (তবে ভালো হতো)। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে যওয়ার জন্য গাধায় আরোহণ করলেন এবং মুসলিমগণ তাঁর সঙ্গে হেটে চললো। আর সে পথ ছিল কংকরময়। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাছে এসে পৌছলে সে বলল, ‘সরো আমার সম্মুখ থেকে। তোমার গাধার দুগন্ধ আমাকে কষ্ট দিচ্ছে।’
তাঁদের মধ্যে থেকে একজন আনসারী বললঃ আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গাধা সুগন্ধে তোমার চাইতে উত্তম। আবদুল্লাহ ইবনু উবাই এর গোত্রে এক ব্যাক্তি রেগে উঠল এবং উভয়ে একে অপরকে গালাগালি করলো। এভাবে উভয়ের পক্ষের সঙ্গীরা ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল এবং উভয় দলের সাথে লাঠালাঠি, হাতাহাতি ও জুতা মারামারি হল। আমাদের জানোান হয়েছে যে, এ ঘটনার প্রেক্ষিতে এ আয়াত নাযিল হলঃ মুমিনদের দু’দল দ্বন্ধে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মিমাংসা করে দিবে। (৪৯ঃ ৯)
আবূ আবদুল্লাহ্ (ইমাম বুখারী) (রহঃ) বলেন, ‘মুসাদ্দাদ (রহঃ) বসার এবং হাদীস বর্ণনার পূর্বে আমি তার থেকে এ হাদীস হাসিল করেছি।
হাদীস নং-২৫১৩। আবদুল আযীয ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) ... উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন, সে ব্যাক্তি মিথ্যাবাদী নয়, যে মানুষের মধ্যে মীমাংসা করার জন্য (নিজের থেকে) ভালো কথা পৌঁছে দেয় কিংবা ভালো কথা বলে।
হাদীস নং-২৫১৪। মুহাম্মদ ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) ... সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, কুবা-এর অধিবাসীরা লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে পড়ল। এমনকি তারা পাথর ছুঁড়োছুঁড়ি শুরু করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সে সংবাদ দেয়া হলে তিনি বললেন, ‘চল তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেই।’
হাদীস নং-২৫১৫। কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) ... ‘আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ وَإِنِ امْرَأَةٌ خَافَتْ مِنْ بَعْلِهَا نُشُوزًا أَوْ إِعْرَاضًا কোন স্ত্রী যদি তার স্বামীর দুর্ব্যবহার ও উপেক্ষার আশংকা করে’ (৪ঃ ১২৮) এই আয়াতটি সম্পর্কে তিনি বলেন, আয়াতের লক্ষ্য হল, ‘সে ব্যাক্তি যে তার স্ত্রীর মধ্যে বার্ধক্য বা অন্য ধরনের অপছন্দনীয় কিছু দেখতে পেয়ে তাকে ত্যাগ করতে মনস্থ করে আর স্ত্রী এ বলে অনুরোধ করে যে, তুমি আমাকে তোমার কাছে রাখ এবং যতটুক ইচ্ছা আমার প্রাপ্য অংশ নির্ধারণ কর।’ ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, ‘উভয়ে সম্মত হলে এতে দোষ নেই।’
হাদীস নং-২৫১৬। আদম (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা ও যায়দ ইবনু খালিদ জুহানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তাঁরা উভয়ে বলেন যে, এক বেদুঈন এসে বলল, ‘ইয়া রাসূলআল্লাহ! আল্লাহর কিতাব মোতাবেক আমাদের মাঝে ফয়সালা করে দিন।’ তখন তাঁর প্রতিপক্ষ দাঁড়িয়ে বলল, ‘সে ঠিকই বলেছে, হ্যাঁ, আপনি আমাদের মাঝে কিতাবুল্লাহ মোতাবেক ফয়সালা করুন।’ পরে বেদুঈন বলল, ‘আমার ছেলে এ লোকের বাড়ীতে মজুর ছিল। তারপর তার স্ত্রীর সাথে সে যিনা করে।’ লোকেরা আমাকে বলল, ‘তোমার ছেলের উপর রাজম (পাথর মেরে হত্যা) ওয়াজিব হয়েছে।’ তখন আমি আমার ছেলেকে একশ’বকরী এবং একটি বাদীর বিনিময়ে এর কাছ থেকে মুক্ত করে এনেছি। পরে আমি আলিমদের কাছে জিজ্ঞাসা করলে তারা বললেন, ‘তোমার ছেলের উপর একশ’ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের নির্বাসন ওয়াজিব হয়েছে।’
সব শুনে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আমি তোমাদের মাঝে কিতাবুল্লাহ মোতাবেকই ফয়সালা করব। বাদী এবং বকরী পাল তোমাকে ফেরত দেওয়া হবে, আর তোমার ছেলেকে একশ’ বেত্রাঘাত সহ এক বছরের নির্বাসন দেওয়া হবে। ’আর অপরজনকে বললেন, ‘হে উনাইস, তুমি আগামীকাল সকালে এ লোকের স্ত্রীর কাছে যাবে (এবং সে স্ত্রী যদি স্বীকার করে) তাকে রাজম করবে।’ উনাইস তার কাছে গেলেন এবং তাকে রাজম করলেন।
হাদীস নং-২৫১৭। ইয়াকুব ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) ... ‘আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কেউ আমাদের এই শরীয়াতে সংগত নয় এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যান করো হবে। ’আবদুল্লাহ ইবনু জা‘ফর মাখরামী (রহঃ) ও আব্দুল ওয়াহিদ ইবনু আবূ ‘আউন সা‘দ ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) থেকে তা বর্ণনা করেছেন।
হাদীস নং-২৫১৮। মুহাম্মদ ইবনু বাশশার (রহঃ) ... বারা’ ইবনু ‘আযিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদায়বিয়াতে (মক্কাবাসীদের সাথে) সন্ধি করার সময় আলী (রাঃ) উভয় পক্ষের মাঝে এক চুক্তিপত্র লিখলেন। তিনি লিখলেন, 'মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ'। মুশরিকরা বলল, 'মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ' লেখা চলবে না। আপনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলে আপনার সঙ্গে লড়াই কিসের?’ তখন তিনি আলীকে বললেন, ‘ওটা মুছে দাও। ’আলী (রাঃ) বললেন, ‘আমি তা মুছব না।’ তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা নিজ হাতে মুছে দিলেন এবং এই শর্তে তাদের সাথে সন্ধি করলেন যে, তিনি এবং তাঁর সাহাবা তিন দিনের জন্য মক্কায় প্রবেশ করবেন এবং জুলুব্বান جُلُبَّانِ السِّلاَحِ ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে প্রবেশ করবেন না। তারা জিজ্ঞাসা করল, جُلُبَّانِ السِّلاَحِ মানে কি? তিনি বললেন, ‘জুলুব্বান’ অর্থ ভিতরে তরবারীসহ খাপ।’
হাদীস নং-২৫১৯। উবায়দুল্লাহ ইবনু মূসা (রহঃ) ... বারা’ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যিলকাদ মাসে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমরার উদ্দেশ্যে বের হলেন। কিন্তু মক্কাবাসীরা তাঁকে মক্কা প্রবেশের জন্য ছেড়ে দিতে অস্বীকার করল। অবশেষে এই শর্তে তাদের সাথে ফয়সালা করলেন যে, তিন দিন সেখাসে অবস্থান করবেন। সন্ধিপত্র লিখতে গিয়ে মুসলিমরা লিখলেন, এ সন্ধিপত্র সম্পাদন করেছেন, ‘আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।’ তারা (মুশরিকরা) বলল, ‘আমরা তাঁর রিসালাত স্বীকার করি না। আমরা যদি এ কথাই মনে করতাম যে, আপনি আল্লাহর রাসূল তাহলে আপনাকে বাধা দিতাম না। তবে আপনি হলেন, আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ।’ তিনি বললেন, ‘আমি আল্লাহর রাসূল এবং আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ।’
তারপর তিনি আলীকে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শব্দটি মুছে দাও। তিনি বললেন, না। আল্লাহর কসম, আমি আপনাকে (রাসূলুল্লাহ শব্দটি) কখনো মুছবো না।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন চুক্তিপত্রটি নিলেন এবং লিখলেন, ‘এ সন্ধিপত্র মুহাম্মদ ইবনু আবদুল্লাহ সম্পন্ন করেন-খাপবদ্ধ অস্ত্র ছাড়া আর কিছু নিয়ে তিনি মক্কায় প্রবেশ করবেন না। মক্কাবাসীদের কেউ তাঁর সঙ্গে যেতে চাইলে তিনি বের করে দিবেন না। আর তাঁর সঙ্গীদের কেউ মক্কায় থাকতে চাইলে তাকে বাধা দিবেন না।’ (সন্ধির শর্ত মুতাবেক) তিনি যখন মক্কায় প্রবেশ করলেন এবং নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হয়ে গেল, তখন তারা এসে আলীকে বলল, ‘তোমার সঙ্গীকে আমাদের এখান থেকে বের হতে বল। কেননা নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে।’
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রওয়ানা হলেন। তখন হামযার মেয়ে হে চাচা, হে চাচা, বলে তাদের পেচনে পেছনে চলল। আলী (রাঃ) তাকে হাত ধরে নিয়ে এলেন এবং ফাতিমাকে বললেন, ‘এই নাও তোমার চাচার মেয়েকে। আমি ওকে তুলে এনেছি।’ আলী, যায়দ ও জা‘ফর তাকে নেওয়ার ব্যাপারে বিতর্কে প্রবৃত্ত হলেন। আলী (রাঃ) বললেন, ‘আমি তার বেশী হকদার। কারণ সে আমার চাচার মেয়ে। জাফর (রাঃ) বললেন, সে আমার চাচার মেয়ে এবং তার খালা অমার স্ত্রী।’ যায়দ (রাঃ) বললেন, ‘সে আমার ভাইয়ের মেয়ে।’
এরপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালার অনুকূলে ফয়সালা দিলেন এবং বললেন, ‘খালা মায়ের স্থলবর্তিনী।’ আর আলীকে বললেন, ‘আমি তোমার এবং তুমি আমার।’ জাফরকে বললেন, ‘তুমি আকৃতি ও প্রকৃতিতে আমার সদৃশ। আর যায়দকে বললেন, ‘তুমি তো আমাদের ভাই ও আযাদকৃত গোলাম।’
হাদীস নং-২৫২০। মুহাম্মদ ইবনু রাফি‘ (রহঃ) ... ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমরা করতে রওয়ানা হলেন। কিন্তু কুরাইশ কাফিররা তাঁর ও বায়তুল্লাহর মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল। তখন তিনি হুদায়বিয়াতে তাঁর হাদী কুরবানী করলেন, আর মাথা মুড়ালেন এবং তাদের সাথে সন্ধি করলেন এই শর্তে যে, আগামী বছর তিনি উমরা করবেন আর (কোষবদ্ধ) তরবারী ছাড়া অন্য কোন অস্ত্র নিয়ে তাদের কাছে আসবেন না। আর তারা যতদিন পছন্দ করবেন তিনি ততদিন সেখানে থাকবেন। পরের বছর তিনি উমরা করলেন এবং যেমনি সন্ধি করেছিলেন তেমনিভাবে মক্কায় অবস্থা করলেন। তারা তাঁকে বেরিয়ে যেতে বললে, তিনি বেরিয়ে গেলেন।
হাদীস নং-২৫২১। মুসাদ্দাদ (রহঃ) ... সাহল ইবনু আবূ হাসমা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, খায়বার সন্ধিবদ্ধ থাকাকালে আবদুল্লাহ ইবনু সাহল ও মুহাইয়াসা ইবনু মাসউদ ইবনু যায়দ (রাঃ) খায়বার গিয়েছিলেন।
হাদীস নং-২৫২২। মুহাম্মদ ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রহঃ) ... আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রুবাইয়্যি বিনতে নাযর (রাঃ) এক কিশোরীর সামনে দাঁত ভেঙ্গে ফেলেছিল। তারা ক্ষতিপূরণ দাবি করল আর অপর পক্ষ ক্ষমা চাইল। তারা অস্বীকার করল এবং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এল। তিনি কিসাসের নির্দেশ দিলেন। আনাস ইবনু নাযর (রাঃ) তখন বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! রুবাইয়্যি এর দাঁত ভাঙ্গা হবে? না, যিনি আপনাকে সত্য সহ পাঠিয়েছেন তাঁর কসম তার দাঁত ভাঙ্গা হবে না। তিনি বললেন, হে আনাস, আল্লাহর বিধান হল কিসাস।’ তারপর বাদীপক্ষ রাজি হয় এবং ক্ষমা করে দেয়। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এমন বান্দাও রয়েছেন যে, আল্লাহর নামে কোন কসম করলে তা পূরণ করেন। ফাযারী (রহঃ) হুমায়দ (রহঃ) সূত্রে আনাস (রাঃ) থেকে রিওয়ায়াত করতে গিয়ে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, তখন লোকেরা সম্মত হল এবং ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করল।
হাদীস নং-২৫২৩। আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) ... হাসান (বসরী) (রহঃ) বলেন, আল্লাহর কসম, হাসান ইবনু আলী (রাঃ) পর্বত সদৃশ সেনাদল নিয়ে মু‘আবিয়া (রাঃ) এর মুখোমুখি হলেন। আমার ইবনু আস (রাঃ) বললেন, আমি এমন সেনাদল দেখতে পাচ্ছি যারা প্রতিপক্ষকে হত্যা না করে ফির যাবে না। মু‘আবিয়া (রাঃ) তখন বললেন, আল্লাহর কসম! (আর মু‘আবিয়া ও আমর ইবনুল ‘আস) (রাঃ) উভয়ের মধ্যে মু‘আবিয়া (রাঃ) ছিলেন উত্তম ব্যাক্তি। ‘হে ‘আমর! এরা ওদের এবং ওরা এদের হত্যা করলে আমি কাকে দিয়ে লোকের সমস্যার সমাধান করব? তাদের নারীদের কে তত্ত্ববধান করবে? তাদের দূর্বল ও শিশুদের কে রক্ষণাবেক্ষণ করবে? তারপর তিনি কুরায়শের বানূ আবদে শামস শাখার দু’জন আবদুর রহমান ইবনু সামুরাহ ও আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) কে হাসান (রাঃ) এর কাছে পাঠালেন। তিনি তাদের বললেন, ‘তোমরা উভয়ে এই লোকটির কাছে যাও এবং তার কাছে (সন্ধির) প্রস্তাব পেশ করো, তাঁর সঙ্গে আলোচনা কর ও তার বক্তব্য জানতে চেষ্টা কর।’
তারা তার কাছে গেলেন এবং তার সঙ্গে কখা বললেন, আলাপ-আলোচনা করলেন এবং তার বক্তব্য জানলেন। হাসান ইবনু আলী (রাঃ) তাদের বললেন, ‘আমরা আবদুল মুত্তালিবের সন্তান, এই সম্পদ (বায়তুল মালের) আমরা পেয়েছি। আর এরা রক্তপাতে লিপ্ত হয়েছে।’ তারা উভয়ে বললেন, (মু‘আবিয়া (রাঃ) আপনার কাছে এরূপ বক্তব্য পেশ করেছেন। আর আপনার বক্তব্যও জানতে চেয়েছেন ও সন্ধি কামনা করেছেন। তিনি বললেন, ‘এ দায়িত্ব কে নেবে? তারা বললেন, আমরা আপনার জন্য এ দায়িত্ব গ্রহণ করছি।’ এরপর তিনি তাদের কাছে যে সব প্রশ্ন করলেন, তারা (তার জওয়াবে) বললেন, ‘আমরা এ দায়িত্ব নিচ্ছি।’ তারপর তিনি তার সাথে সন্ধি করলেন।
হাসান (বসরী) (রহঃ) বলেন, আমি আবূ বাকরা (রাঃ) কে বলতে শুনেছিঃ রাসূলুল্লাহ কে আমি মিম্বরের উপর দেখেছি, হাসান (রাঃ) তাঁর পাশে ছিলেন। তিনি একবার লোকদের দিকে আর একবার তাঁর দিকে তাকাচ্ছিলেন আর বলছিলেন, আমার এ সন্তান নেতৃস্থানীয়। সম্ভবত তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা মুসলমানের দু’টি বড় দলের মধ্যে মীমাংসা করাবেন।’ আবূ আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, আলী ইবনু আবদুল্লাহ আমাকে বলেছেন যে, এ হাদীসের মাধ্যমেই আবূ বাকরা (রাঃ) থেকে হাসানের শ্রুতি আমাদের কাছে প্রমাণিত হয়েছে।
হাদীস নং-২৫২৪। ইসমাঈল ইবনু আবী ওয়াইস (রহঃ) ... আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার দরজায় বিবাদের আওয়াজ শুনতে পেলেন; দুজন তাদের আওয়াজ উচ্চ করছিল। একজন আরেকজনের কাছে ঋণের কিছু মাফ করে দেওয়ার এবং সহানুভূতি দেখানোর (কিছু সময় দেওয়ার) অনুরোধ করছিল। আর অপর ব্যাক্তি বলছিল, ‘না আল্লাহর কসম! আমি তা করব না।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হযে তাদের কাছে এলেন এবং বললেন, সৎ কাজ করবে না বলে যে আল্লাহর নামে কসম করেছে, সে লোকটি কোথায়? সে বলল, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি। সে যা চাইবে তার জন্য তা-ই হবে।
হাদীস নং-২৫২৫। ইয়াহইয়া ইবনু বুকাইর (রহঃ) ... কাব ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, আবদুল্লাহ ইবনু আবূ হাদরাদ আল-আসলামীর কাছে তার কিছু মাল পাওনা ছিল। রাবী বলেন, একবার সাক্ষাত পেয়ে তিনি তাকে ধরলেন, এমনকি তাদের আওয়াজ চড়ে গেল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি যেন হাতের ইশারায় বলছিলেন, অর্ধেক (নাও)। তারপর তিনি তার পাওনার অর্ধেক নিলেন আর অর্ধেক ছেড়ে (মাফ করে) দিলেন।
হাদীস নং-২৫২৬। ইসহাক (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মানুষের হাতের প্রতিটি জোড়ার জন্য তার উপর সাদকা রয়েছে। সূর্যোদয় হয় এমন প্রতিদিন (অর্থাৎ প্রত্যহ) মানুষের মধ্যে সুবিচার করাও সাদকা।’
হাদীস নং-২৫২৭। আবূল ইয়ামান (রহঃ) ... যুবাইর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি এক আনসারীর সাথে বিবাদ করছিলেন, যিনি বদরে শরীক ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে গিয়ে পাথরী যমীনের একটি নালা সম্পর্কে অভিযোগ করলেন। তারা উভয়ে সে নালা থেকে পানি সেচ করতেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবাইরকে বললেন, ‘হে যুবাইর! তুমি প্রথমে পানি সেচবে। তারপর তোমার প্রতিবেশীর দিকে পানি ছেড়েদিবে।’ আনসারী তখন রেগে গেল এবং বলল, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে আপনার ফুফুর ছেলে বলে (এ বিচার)?’ এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেহারার রঙ্গ বদলে গেল। তারপর তিনি বললেন, ‘তুমি সেচ কর, তারপর পানি আটকে রাখ, বেষ্টনীর বরাবর পৌঁছা পর্যন্ত।’
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবাইর (রাঃ) কে তার পূর্ণ হক দিলেন। এর আগে যুবাইর (রাঃ) কে তিনি এমন নির্দেশ দিয়েছিলেন যা আনসারীর জন্য সুবিধাজনক ছিল। কিন্তু আনসারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে রাগান্বিত করলে সুষ্পষ্ট নির্দেশের মাধ্যমে যুবাইর (রাঃ)-কে তিনি তাঁর পূর্ণ হক দান করলেন। উরওয়া (রাঃ) বলেন, যুবাইর (রাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম! আমার নিশ্চিত ধারণা যে (আল্লাহর বাণী): কিন্তু না, আপনার প্রতিপালকের শপথ! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ তারা তাদের নিজেদের বিবাদ বিসম্বাদের বিচার ভার আপনার উপর অর্পণ না করে। (৪: ৬৫) আয়াতটি সে ব্যাপারেই নাযিল হয়েছিল।
হাদীস নং-২৫২৮। মুহাম্মদ ইবনু বাশশার (রহঃ) ... জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার পিতার মৃত্যু হল, আর তার কিছু ঋণ ছিল। আমি তার ঋণের বিনিময়ে পাওনাদারদের খেজুর নেওয়ার প্রস্তাব দিলাম। তাতে ঋণ পরিশোধ হবে না বলে তারা তা নিতে অস্বীকার করল। আমি তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে এ বিষয়ে তাঁর নিকট উল্লেখ করলাম। তিনি বললেন, খেজুর পেড়ে মাছায় রেখে রাসূলুল্লাহকে খবর দিও।
(যথা সময়ে) তিনি এলেন এবং তাঁর সঙ্গে আবূ বকর ও উমর (রাঃ)-ও ছিলেন। তিনি কেজুর স্তুপের পার্শ্বে বসলেন এবং বরকতের দু‘আ করলেন। পরে বললেন, তোমার পাওনাদারদের ডাক এবং তাদের প্রাপ্য পরিশোধ করে দাও। তারপর আমার পিতার পাওণাদারদের কেউ এমন ছিল না যার ঋণ পরিশোধ করিনি। এরপরও (আমার কাছে) তের ওয়াসক খেজুর উদ্বৃত্ত রয়ে গেল। সাত ওয়াসক (عَجْوَةٌ) মিশ্র খেজুর আর ছয় ওয়াছক (لَوْنٌ) নিম্নমানের খেজুর কিংবা ছয় ওয়াসক মিশ্র ও সাত ওয়াসক নিম্নমানের খেজুর।
তারপর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে মাগরিবের সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলাম এবং তাঁকে তা বললাম। তিনি হাসলেন এবং বললেন, আবূ বকর ও উমরের কাছে গিয়ে তা বল।’ তাঁরা বললেন, ‘আমরা আগেই জানতাম যে, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা করার তা করেছেন, তখন অবশ্য এরূপই হবে।’
হিশাম (রহঃ) ওয়াহাব (রহঃ)-এর মাধ্যমে জাবির (রাঃ) থেকে (বর্ণনায়) আসরের সালাত (নামায/নামাজ)-এর কথা উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি আবূ বকর (রাঃ) এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাসার কথা উল্লেখ করেন নি। তিনি বর্ণনা করেছেন, (জাবির (রাঃ) বলেছেন) আমার পিতা তার যিম্মায় ত্রিশ ওয়াসক ঋণ রেখে মার গিয়েছেন। ইবনু ইসহাক (রহঃ) ওয়াহাব (রহঃ)-এর মাধ্যমে জাবির (রাঃ) থেকে যোহরের সালাত (নামায/নামাজ)-এর কথা উল্লেখ করেছেন।
হাদীস নং-২৫২৯। আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) ... কা‘ব ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যমানায় একবার তিনি ইবনু আবূ হাদরাদের কাছে মসজিদে পাওনা ঋণের তাগাদা করলেন্ এতে উভয়ের আওয়াজ চড়ে গেল। এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ঘর থেকেই আওয়াজ শুনতে পেলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুজরার পর্দা সরিয়ে তাদের কাছে এলেন আর কা‘ব ইবনু মালিক (রাঃ) কে ডাকলেন এবং বললেন, হে কা‘ব! কা‘ব (রাঃ) বললেন, আমি হাযির ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাবী বলেন, তিনি হাতে ইশারা করলেন, অর্ধৈক মওকুপ করে দাও। কা‘ব (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তাই করলাম। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (ইবনু আবূ হাদরাদকে) বললেন, ‘যাও, তার ঋণ পরিশোধ করে দাও।’

সহীহ বুখারী, ৪র্থ খন্ড, অধ্যায়-৪৪, বিষয়ঃ-শাহাদাত।

হাদীস নং-২৪৬১। হাজ্জাজ (রহঃ) ... ইবনু শিহাব (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার নিকট আয়িশা (রাঃ) এর ঘটনা সম্পর্কে উরওয়া, ইবনু মূসায়্যাব, আলকামা, ইবনু ওয়াক্কাস এবং উবায়দুল্লাহ (রহঃ) বর্ণনা করেছেন, তাদের বর্ণিত হাদীসের এক অংশ অন্য অংশের সত্যতা প্রমাণ করে, যা অপবাদকারীরা আয়িশা (রাঃ) সম্পর্কে রটনা করেছিল। এদিকে ওয়াহী অবতরণ বিলম্বিত হল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী ও উসামা (রাঃ) কে স্বীয় সহধর্মিনীকে পৃথক রাখার ব্যাপারে পরামর্শের জন্য ডেকে পাঠালেন। উসামা (রাঃ) তখন বললেন আপনার স্ত্রী সম্পর্কে ভালো ছাড়া কিছুই আমরা জানি না। আর বারীরা (রাঃ) বললেন, তার সম্পর্কে একটি মাত্র কথাই আমি জানি, তা এই যে, অল্প বয়স হওয়ার কারণে পরিবারের লোকদের জন্য আটা খামির করার সময় তিনি ঘুমিয়ে পড়েন আর এই ফাঁকে বকরী এসে তা খেয়ে ফেলে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, সেই ব্যাক্তির বিরুদ্ধে কে আমাকে সাহায্য করবে; যার জ্বালাতন আমার পারিবারিক ব্যাপারে আমাকে আঘাত হেনেছে? আল্লাহর কসম আমার সহধর্মিনী সম্পর্কে আমি ভাল ছাড়া অন্য কিছু জানি না। আর এমন এক ব্যাক্তির কথা তারা বলে, যার সম্পর্কে আমি ভাল ছাড়া অন্য কিছু জানি না।
হাদীস নং-২৪৬২। আবূল ইয়ামন (রহঃ) ... আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও উবাই ইবনু কাআব আনসারী (রাঃ) সেই খেজুর বাগানের উদ্দেশ্যে রওয়ান হলেন, যেখানে ইবনু সাইয়াদ থাকত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন (বাগানে) প্রবেশ করলেন, তখন তিনি সতর্কতার সাথে খেজুর শাখার আড়ালে আড়ালে চললেন। তিনি চাচ্ছিলেন, ইবনু সাইয়াদ তাকে দেখে ফেলার আগেই তিনি তার কোন কথা শুনে নিবেন। ইবনু সাইয়াদ তখন চাঁদর মুড়ি দিয়ে বিছানায় শায়িত ছিলো। আর গুন গুন বা (রাবী বলেছেন) গুমগুমভাবে কিছু বলছিল। এ সময় ইবনু সাইয়াদের মা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে খেজুর শাখার আড়ালে আড়ালে সতর্কতার সাথে আসতে দেখে ইবনু সাইয়াদকে বলল, হে সাফ! (নামের সংক্ষেপ) এই মুহাম্মদ! তখন ইবনু সাইয়াদ চুপ হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে (তার মা) যদি (কিছু না বলে) তাকে নিজের অবস্থায় ছেড়ে দিত, তাহলে (তার প্রকৃত অবস্থা আমাদের সামনে) প্রকাশ পেয়ে যেত।
হাদীস নং-২৪৬৩। আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) ... আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রিফাআ কুরাযীর স্ত্রী নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বলল, আমি রিফা’আর স্ত্রী ছিলাম। কিন্তু সে আমাকে বায়েন তালাক দিয়ে দিল। পরে আমি আবদুর ইবনু যুবাইরকে বিয়ে করলাম। কিন্তু তার সাথে রয়েছে কাপড়ের আচলের মত নরম কিছু (অর্থাৎ সে পুরুষত্বহীন) তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তবে কি তুমি রিফা’আর কাছে ফিরে যেতে চাও? না, তা হয় না, যতক্ষন না তুমি তার মধুর স্বাদ গ্রহন করবে আর সে তোমার মধুর স্বাদ গ্রহন করবে। আবূ বকর (রাঃ) তখন তার কাছে বসা ছিলেন। আর খালিদ ইবনু সাঈদ ইবনু আস (রাঃ) দ্বারাপ্রান্তে প্রবেশের অনুমতির অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি বললেন, হে আবূ বকর! মহিলা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকটে উচ্চৈঃস্বরে যা বলছে, তা কি আপনি শুনতে পাচ্ছেন না?
হাদীস নং-২৪৬৪। হিববান (রহঃ) ... উকবা ইবনু হারিছ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি আবূ ইহাব ইবনু আযীযের কন্যাকে বিয়ে করলেন। পরে জনৈক মহিলা এসে বলল, আমি তো উকবা এবং যাকে সে বিয়ে করেছে দু’জনকেই দুধ পান করিয়েছি। উকবা (রাঃ) তাকে বললেন, এটা তো আমার জানা নেই যে, আপনি আমাকে দুধ পান করিয়েছেন আর আপনিও এ বিষয়ে আমাকে অবহিত করেন নি। এরপর আবূ ইহাব পরিবারের কাছে লোক পাঠিয়ে তিনি তাদের কাছে (এ সম্পর্কে) জানোনে চাইলেন। তারা বলল, সে আমাদের মেয়েকে দুধ পান করিয়েছে বলে তো আমাদের জানা নেই। তখন তিনি মদিনার উদ্দ্যেশ্যে সাওয়ার হলেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যখন এরূপ বলা হয়েছে তখন এটা (আবূ ইহাবের কন্যাকে বিয়ে করা) কিভাবে সম্ভব? তখন উকবা (রাঃ) তাকে ত্যাগ করলেন। আর সে অন্য জনকে বিয়ে করল।
হাদীস নং-২৪৬৫। হাকাম ইবনু নাফি (রহঃ) ... উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যামানায় কিছু লোককে ওয়াহীর ভিত্তিতে পাকড়াও করা হত। এখন যেহেতু ওয়াহী বন্ধ হয়ে গেছে, সেহেতু এখন আমাদের সামনে তোমাদের যে ধরনের আমল প্রকাশ পাবে, সেগুলোর ভিত্তিতেই আমরা তোমাদের বিচার করবো। কাজেই যে ব্যাক্তি আমাদের সামনে ভালো প্রকাশ করবে তাকে আমরা নিরাপত্তা দান করবো এবং কাছে টানবো তার অন্তরের বিষয়ে আমাদের কিছু করণীয় নেই। আল্লাহই তার অন্তরের বিষয়ে হিসাব নিবেন। আর যে ব্যাক্তি আমাদের সামনে মন্দ আমল প্রকাশ করবে, তার প্রতি আমরা তাদের নিরাপত্তা প্রদান করবো না এবং সত্যবাদী বলে গ্রহনও করবো না; যদিও সে বলে যে, তার অন্তর ভাল।
হাদীস নং-২৪৬৬। সুলাইমান ইবনু হারব (রহঃ) ... আনাস (রাঃ) থেকে বর্নিত তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্মুখ দিয়ে এক জানাযা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। লোকটি সম্পর্কে সবাই প্রশংসা করছিলেন। তিনি বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেছে। পরে আরেকটি জানাযা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। লোকেরা তার সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করলো কিংবা বর্ণানাকারী অন্য কোন শব্দ বলেছেন। তিনি বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেছে। তখন বলা হল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ ব্যাক্তি সম্পর্কে বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেছে আবার ঐ ব্যাক্তি সম্পর্কে বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেছে। তিনি বললেন, মানুষের সাক্ষ্য (গ্রহণযোগ্য) আর মু’মিনগন হলেন পৃথিবীতে আল্লাহর সাক্ষ্যদাতা।
হাদীস নং-২৪৬৭। মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) ... আবূল আসওয়াদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি মদিনায় আসলাম, সেখানে তখন মহামারী দেখা দিয়েছিল। এতে ব্যাপক হারে লোক মারা যাচ্ছিল। আমি উমর (রাঃ) এর কাছে বসাছিলাম। এমন সময় একটি জানাযা অতিক্রম করলো এবং তার সম্পর্কে ভালো ধরনের মন্তব্য করা হল। তা শুনে উমর (রাঃ) বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেছে। এরপর আরেকটি জানাযা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল এবং তার সম্পর্কেও ভালো মন্তব্য করা হল। তা শুনে তিনি বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেছে। এরপর তৃতীয় জানাযা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল এবং তার সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করা হল। এবারও তিনি বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কি ওয়াজিব হয়ে গেছে, হে আমীরুল মু’মিনীন? তিনি বললেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন বলেছিলেন, আমি তেমন বললাম। (তিনি বলেছিলেন) কোন মুসলমান সম্পর্কে চার জন লোক ভাল সাক্ষ্য দিলে আল্লাহ্‌ তাঁকে জান্নাতে দাখিল করবেন। তিনি বললেন, তিনজন সাক্ষ্য দিলেও। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, দু'জন সাক্ষ্য দিলে? তিনি বললেন, দু’জন সাক্ষ্য দিলেও। এরপর আমরা একজনের সাক্ষ্য সম্পর্কে তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করিনি।
হাদীস নং-২৪৬৮। আদম (রহঃ) ... আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আফলাহ্ (রাঃ) আমার সাক্ষাতের অনুমতি চাইলেন। আমি অনুমতি না দেওয়ায় তিনি বললেন, আমি তোমার চাচা, অথচ তুমি আমার সাথে পর্দা করছ? আমি বললাম, তা কিভাবে? তিনি বললেন, আমার ভাইয়ের স্ত্রী, আমার ভাইয়ের দুধ (ভাইয়ের কারনে তার স্তনে হওয়া দুধ) তোমাকে পান করিয়েছে। আয়িশা (রাঃ) বলেন, এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আমি জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আফলাহ্ (রাঃ) ঠিক কথাই বলেছে। তাকে (সাক্ষাতের) অনুমতি দিও।
হাদীস নং-২৪৬৯। মুসলিম ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) ... ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হামযার কন্যা সম্পর্কে বলেছেন, সে আমার জন্য হালাল নয়। কেননা বংশ সম্পর্কের কারনে যা হারাম হয়, দুধ পানের সম্পর্কের কারনেও তা হারাম হয়, আর সে আমার দুধ ভাইয়ের কন্যা।
হাদীস নং-২৪৭০। আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) ... আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে অবস্থান করছিলেন। এমন সময় তিনি একজন লোকের আওয়াজ শুনতে পেলেন। সে হাফসা (রাঃ) এর ঘরে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থন করছে। আয়িশা (রাঃ) বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই যে, একজন লোক আপনার ঘরে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করছে। তিনি বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে হাফসার অমুক দুধ চাচা বলে মনে হচ্ছে। তখন আয়িশা (রাঃ) বললেন, আচ্ছা আমার অমুক দুধ চাচা যদি জীবিত থাকত তাহলে সে কি আমার ঘরে প্রবেশ করতে পারত? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ পারত। কেননা, জন্মসূত্রে যা হারাম, দুধ পানেও তা হারাম হয়ে যায়।
হাদীস নং-২৪৭১। মুহাম্মদ বিন কাছীর (রহঃ) ... আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট তাশরীফ আনলেন, তখন আমার কাছে একজন লোক ছিল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, হে আয়িশা! এ কে? আমি বললাম, আমার দুধ ভাই। তিনি বললেন, হে আয়িশা! কে তোমার সত্যিকার দুধ ভাই তা যাচাই করে রেখে নিও। কেননা, ক্ষুধার কারণে (অর্থাৎ শিশু বয়সে শরীআত অনুমোদিত মুদ্দতে) দুধ পানের ফলেই শুধু দুধ সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ইবনু মাহদী (রহঃ) সুফিয়ান (রহঃ) থেকে হাদীস বর্ণনায় মুহাম্মদ ইবনু কাছীর (রহঃ) এর অনুসরন করেছেন।
হাদীস নং-২৪৭২। ইসমাঈল (রহঃ) ... উরওয়া ইবনু যবায়র (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, মক্কা বিজয়ের সময় জনৈকা মহিলা চুরি করলে তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে হাযির করা হল, তারপর তিনি তার সম্পর্কে নির্দেশ জারি কলে তার হাত কাটা হল। আয়িশা (রাঃ) বলেন, এরপর খাটি তাওবা করল এবং বিয়ে করলো। তারপর সে (মাঝে মাঝে আমার কাছে) আসলে আমি তার প্রয়োজন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে পেশ করতাম।
হাদীস নং-২৪৭৩। ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) ... যায়দ ইবনু খালিদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবিবাহিত ব্যভিচারী সম্পর্কে একশ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের নির্বাসনের নির্দেশ দিয়েছেন।
হাদীস নং-২৪৭৪। আবদান (রহঃ) ... নু’মান ইবনু বাশীর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার মাতা আমার পিতাকে তার মালের কিছু অংশ আমাকে দান করতে বললেন। পরে তাকে দেওয়া ভালো মনে করলে আমাকে তা দান করেন। তিনি (আমার মাতা) তখন বললেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সাক্ষী করা ছাড়া আমি রাযী নই। এরপর তিনি (আমার পিতা) আমার হাত ধরে আমাকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট নিয়ে গেলেন, আমি তখন বালক মাত্র। তিনি বললেন, এর মা বিনত রাওয়াহা একে কিছু দান করা জন্য আমার কাছে আবদার জানিয়েছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, সে ছাড়া তোমার আর কোন ছেলে আছে? তিনি বললেন হ্যাঁ, আছে। নু’মান (রাঃ) বলেন, আমার মনে পড়ে, তিনি বলেছিলেন, আমাকে অন্যায় কাজে সাক্ষী করবেন না। আর আবূ হারীয (রহঃ) ইমাম শাবী (রহঃ) সূত্রে বর্ণনা করেছেন, আমি অন্যায় কাজে সাক্ষী হতে পারি না।
হাদীস নং-২৪৭৫। আদম (রহঃ) ... ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার যুগের লোকেরাই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। তারপর তাদের নিকটবর্তী যুগের লোকেরা, এরপর নিকটবর্তী যুগের লোকেরা। ইমরান (রাঃ) বলেন, আমি বলতে পারছি না, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তার যুগের) পরে দুই যুগের কথা বলছিলেন, না তিন যুগের কথা। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের পর এমন লোকদের আগমন ঘটবে, যারা খিয়ানত করবে, আমানতদারী রক্ষা করবে না। সাক্ষ্য দিতে না ডাকলেও তারা সাক্ষ্য দিবে। তারা মান্নত করবে কিন্তু তা পূর্ণ করবে, না। তাদের মধ্যে মেদ বৃদ্ধি পাবে।
হাদীস নং-২৪৭৬। মুহাম্মদ ইবনু কাছীর (রহঃ) ... আবদুল্লাহ ইবনু মাস’উদ) (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার যুগের লোকেরাই হচ্ছে সর্বোত্তম লোক, এরপর যারা তাদের নিকটবর্তী, এরপর যারা তাদের নিকটবর্তী যুগের। এরপরে এমন সব লোক আসবে যারা কসম করার আগেই সাক্ষ্য দিবে, আবার সাক্ষ্য দেওয়ার আগে কসম করে বসবে। ইবরাহীম (নাখ্ঈ) (রহঃ) বলেন, আমাদেরকে সাক্ষ্য দিলে ও অঙ্গীকার করলে মারতেন।
হাদীস নং-২৪৭৭। আবদুল্লাহ ইবনু মুনীর (রহঃ) ... আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কবীরা গুনাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, (সেগুলো হচ্ছে) আল্লাহর সাথে শরীক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, কাউকে হত্যা করা এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া। গুনদর, আবূ আমির, বাহয ও আবদুস সামাদ (রহঃ) শু’বা (রহঃ) থেকে হাদীস বর্ণনায় ওয়াহাব (রহঃ) এর অনুসরণ করেছেন।
হাদীস নং-২৪৭৮। মুসাদ্দদ (রহঃ) ... আবূ বকর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন তিনবার বললেন, আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহগুলো সম্পর্কে অবহিত করব না? সকলে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অবশ্য বলুন। তিনি বললেন, (সে গুলো হচ্ছে) আল্লাহর সাথে শিরক করা এবং পিতামাতার অবাধ্য হওয়া। তিনি হেলান দিয়ে বসেছিলেন; এবার সোজা হয়ে বসলেন এবং বললেন, শুনে রাখো, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, এ কথাটি তিনি বার বার বলতে থাকলেন। এমনকি আমরা বলতে লাগলাম, আর যদি তিনি না বলতেন।
হাদীস নং-২৪৭৯। মুহাম্মদ ইবনু উবায়দ ইবনু মায়মুন (রহঃ) ... আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক লোককে মসজিদে (কুরআন) পড়তে শুনলেন। তিনি বললেন, আল্লাহ তাকে রহম করুন। সে আমাকে অমুক সূরার অমুক অমুক আয়াত স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, যা আমি ভূলে গিয়েছিলাম। আব্বাদ ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে এতটুকু অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে তাহাজ্জুদের সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। সে সময় তিনি মসজিদে সালাত (নামায/নামাজ) রত আববাদের আওয়াজ শুনতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আয়িশা! এটা কি আববাদের কন্ঠস্বর? আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ আব্বাদকে রহম করুন।
হাদীস নং-২৪৮০। মালিক ইবনু ইসমাঈন (রহঃ) ... আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বিলাল (রাঃ) রাত থাকতেই আযান দিয়ে থাকে। সুতরাং ইবনু উম্মু মাকতুম (রাঃ) আযান দেওয়া পর্যন্ত তোমরা পানাহার করতে পার। অথবা তিনি বলেন, ইবনু উম্মু মাকতুমের আযান শোনা পর্যন্ত। ইবনু উম্মে মাকতুম (রাঃ) অন্ধ ছিলেন, ফলে ভোর হয়ে যাচ্ছে, লোকেরা একথা তাকে না বলা পর্যন্ত তিনি আযান দিতেন না।
হাদীস নং-২৪৮১। যিয়াদ ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) ... মিসওয়ার ইবনু মাখরাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে কিছু ‘কাবা’ (পোশাক বিশেষ) আসল। আমার পিতা মাখরামা (রাঃ) তা শুনে আমাকে বললেন, আমাকে তার কাছে নিয়ে চলো। সেখান থেকে তিনি আমাদের কিছু দিতেও পারেন। আমার পিতা দরজার সামনে দাড়িয়ে কথা বললেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কন্ঠস্বর চিনতে পারলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন একটি ‘কাবা’ সাথে করে বেরিয়ে এলেন, তিনি তার সৌন্দর্য বর্ণনা করছিলেন এবং বলছিলেন, আমি এটা তোমার জন্য লুকিয়ে রেখেছিলাম। আমি এটা তোমার জন্য লুকিয়ে রেখে ছিলাম।
হাদীস নং-২৪৮২। ইবনু আবূ মারয়াম (রাঃ) ... আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহিলাদের সাক্ষ্য কি পুরুষদের সাক্ষ্যের অর্ধেক নয়? তারা (উপস্থিত মহিলারা) বলল, তাতো অবশ্যই অর্ধেক। তিনি বলেন, এটা মহিলার জ্ঞানের ত্রুটির কারণেই।
হাদীস নং-২৪৮৩। আবূ আসিম (রহঃ) ও আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) ... উকবা ইবনু হারিস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি উম্মু ইয়াহইয়া বিনত আবূ ইহাবকে বিয়ে করলেন। তিন বলেন, তখন কালো বর্ণের এক দাসী এসে বলল, আমি তো তোমাদের দু’দুজনকে দুধপান করিয়েছি। সে কথা আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে উত্থাপন করলে তিনি আমার দিক থেকে মূখ ফিরিয়ে নিলেন। আমি সরে গেলাম। পরে এসে বিষয়টি (আবার) তার কাছে উত্থাপন করলাম। তিনি তখন বললেন, (এ বিয়ে হতে পারে) কি ভাবে? সে তো দাবী করছে যে, তোমাদের দু’জনকেই সে দুধ পান করিয়েছে। এরপর তিনি তাকে (উকবাকে) তার (উম্মু ইহাবের) সাথে বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করতে বললেন।
হাদীস নং-২৪৮৪। আবূ আসিম (রহঃ) ... উকবা ইবনু হারিছ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক মহিলাকে আমি বিয়ে করলাম। কিন্তু আরেক মহিলা এসে বলল, আমি তো তোমাদের দু’জনকে দুগ্ধপান করিয়েছি, তখন আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে গিয়ে (বিষয়টি) উল্লেখ করলাম। তিনি বললেন, এমন কথা যখন বলা হয়েছে তখন আর তা (বিয়ে) কিভাবে সম্ভব? তাকে তুমি পরিত্যাগ কর। অথবা তিনি অনুরূপ কিছু বললেন।
হাদীস নং-২৪৮৫। আবূ রাবী সুলাইমান ইবনু দাউদ (রহঃ) ... নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিনী আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, মিথ্যা অপবাদকারীরা যখন তার সম্পর্কে অপবাদ রটনা করল এবং আল্লাহ তা থেকে তার পবিত্রতা ঘোষনা করলেন। রাবীগণ বলেন, আয়িশা (রাঃ) বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে বের হওয়ার ইচ্ছা করলে স্বীয় সহধর্মিণীদের মধ্যে কুর’আ ঢালার মাধ্যমে সফর সংগিণী নির্বাচন করতেন। তাদের মধ্যে যার নাম বেরিয়ে আসত তাকেই তিনি নিজের সঙ্গে নিয়ে যেতেন। এক যুদ্ধে যাওয়ার সময় তিনি আমাদের মধ্যে কুর’আ ঢাললেন, তাতে আমার নাম বেরিয়ে এলো। তাই আমি তার সঙ্গে (সফরে) বের হলাম। এটা পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার পরের ঘটনা।
আমাকে হাওদার ভিতরে সাওয়ারীতে উঠানো হতো, আবার হাওদার ভিতরে (থাকা অবস্থায়) নামানো হতো। এভাবেই আমরা সফর করতে থাকলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ যুদ্ধ শেষ করে যখন প্রত্যাবর্তন করলেন এবং আমরা মদিনার কাছে পৌছে গেলাম তখন এক রাতে তিনি (কাফেলাকে) মনযিল ত্যাগ করার ঘোষণা দিলেন। উক্ত ঘোষনা দেওয়ার সময় আমি উঠে সেনাদলকে অতিক্রম করে গেলাম এবং নিজের প্রয়োজন সেরে হাওদায় ফিরে এলাম। তখন বুকে হাত দিয়ে দেখি আযফার দেশীয় সাদাকালো পাথরের তৈরি আমার একটা মালা ছিড়ে পড়ে গেছে। তখন আমি আমার মালার সন্ধানে ফিরে গেলাম, এবং সন্ধান কার্য আমাকে দেরী করিয়ে দিলো। ওদিকে যারা আমার হাওদা উঠিয়ে দিতো তারা তা উঠিয়ে যে উটে আমি সওয়ার হতাম, তার পিঠে রেখে দিলো। তাদের ধারনা ছিলো যে, আমি হাওদাতেই আছি। তখনকার মেয়েরা হালকা পাতলা হতো, মোটা সোটা হতো না। কেননা খুব সামান্য খাবার তারা থেতে পেতো। তাই হাওদায় উঠতে গিয়ে ভার তাদের কাছে অস্বাভাবিক বলে মনে হল না।
তদুপরি সে সময় আমি অল্প বয়স্ক কিশোরী ছিলাম এবং তখন তারা হাওদা উঠিয়ে উট হাকিয়ে রওনা হয়ে গেলো। এদিকে সেনাদল চলে যাওয়ার পর আমি আমার মালা পেয়ে গেলাম। কিন্তু তাদের জায়গায় ফিরে এসে দেখি, সেখানে কেউ নেই। তখন আমি আমার জায়গায় এসে বসে থাকাই মনন্থ করলাম। আমার ধারনা ছিল যে, আমাকে না পেয়ে আবার এখানে তারা ফিরে আসবে। বসে থাকা অবস্থায় আমার দু চোখে ঘুম নেমে এলে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। সাফওয়ান ইবনু মুআত্তাল, যিনি প্রথমে সুলামী এবং পরে যাকওয়ানী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, সেনা দলের পিছনে (পরিদর্শক হিসেবে) থেকে গিয়েছিলেন। সকালের দিকে আমার অবস্থান স্থলের কাছাকাছি এসে পৌছলেন এবং একজন ঘুমন্ত মানুষের অবয়ব দেখতে পেয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। পর্দার বিধান নাযিলের আগে তিনি আমাকে দেখেছিলেন। সে সময় তিনি উট বসাচ্ছিলেন, সে সময় তার ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ শব্দে আমি জেগে গেলাম। তিনি উটের সামনের পা চেপে ধরলে আমি তাতে সওয়ার হলাম। আর তিনি আমাকে নিয়ে সাওয়ারী হাকিয়ে চললেন।
সেনাদল ঠিক দুপুরে যখন অবতরণ করে বিশ্রাম করছিল, তখন আমরা সেনাদলে পৌছলাম। সে সময় যারা ধ্বংস হওয়ার, তারা ধ্বংস হল। অপবাদ রটনায় যে নেতৃত্ব দিয়েছিল, সে হল (মুনাফিকের সরদার) আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সালুল। আমরা মদিনায় উপনীত হলাম এবং আমি এসেই একমাস অসুস্থতায় ভোগলাম। এদিকে কিছু লোক অপবাদ রটনাকারীদের রটনা নিয়ে চর্চা করতে থাকল। আমার অসুস্থার সময় এ বিষয়টি আমাকে সন্দিহান করে তুললো যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তরফ থেকে সেই স্নেহ আমি অনুভব করছিলাম না, যা আমার অসুস্থতার সময় সচরাচর আমি অনুভব করতাম। তিনি শুধু ঘরে প্রবেশ কলে সালাম দিয়ে বলতেন কেমন আছ? আমি সে বিষয়ের কিছুই জানতাম না। শেষ পর্যন্ত খুব দুর্বল হয়ে পড়লাম।
(একরাতে) আমি ও উম্মু মিসতাহ্ প্রয়োজন সারার উদ্দেশ্যে ময়দানে বের হলাম। আমরা রাতেই শুধু সে দিকে যেতাম। এ আমাদের ঘরগুলোর নিকটবর্তী স্থানে পায়খানা বানানোর আগের নিয়ম। জংগলে কিংবা দুরবর্তী স্থানে প্রয়োজন সারার ব্যাপারে আমাদের অবস্থাটা প্রথম যুগের আরবদের মতই ছিলো। যাই হোক, আমি এবং উম্মু মিসতাহ বিনত আবূ রুহম হেটে চলছিলাম। ইত্যবসরে সে তার চাঁদরে পা জড়িয়ে হোচট খেলো এবং (পড়ে গিয়ে) বললো মিসতাহ এর জন্য দুর্ভোগ। আমি তাকে বললাম, তুমি খুব খারাপ কথা বলেছ। বদর যুদ্ধে শরীক হয়েছে, এমন এক লোককে তুমি অভিশাপ দিচ্ছ! সে বলল, হে সরলমান! (তোমার সম্পর্কে) যে সব কথা তারা উঠিয়েছে, তা কি তুমি শুনোনি? এরপর অপবাদ রটনাকারীদের সব রটনা সম্পর্কে সে আমাকে অবহিত করলো।
তখন আমার রোগের উপর রোগের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলো। আমি ঘরে ফিরে আসার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, কেমন আছো? আমি বললাম, আমাকে আমার পিতা-মাতার কাছে যাওয়ার অনুমতি দিন। তিনি (আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি তখন তাদের (পিতা-মাতার) কাছ থেকে এ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে অনুমতি দিলেন। আমি আমার পিতা-মাতার কাছে গেলাম। তারপর আমি মাকে বললাম, লোকেরা কি বলাবলি করে? তিনি বললেন, বেটি! ব্যাপারটাকে নিজের জন্য হালকাভাবেই গ্রহন কর। আল্লাহর কসম! এমন সুন্দরী নারী খুব কমই আছে, যাকে তার স্বামী ভালোবাসে আর তার একাধিক সতীনও আছে; অথচ ওরা তাকে উত্ত্যক্ত করে না।
আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ্। লোকেরা সত্যি তবে এসব কথা রটিয়েছে? তিনি (আয়িশা) বলেন, ভোর পর্যন্ত সে রাত আমার এমনভাবে কেটে গেলো যে, চোখের পানি আমার বন্ধ হল না এবং ঘুমের একটু পরশও পেলাম না। এভাবে ভোর হল। পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াহীর বিলম্ব দেখে আপন স্ত্রীকে বর্জনের ব্যাপারে ইবনু আবূ তালিব ও উসামা ইবন যায়দকে ডেকে পাঠালেন। যাই হোক; উসামা পরিবারের জন্য তার (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ভালোবাসার প্রতি লক্ষ্য করে পরামর্শ দিতে গিয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর কসম (তার সম্পর্কে) ভালো ছাড়া অন্য কিছু আমরা জানিনা, আর আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিছুতেই আল্লাহ্ আপনার পথ সংকীর্ণ করেননি। তাকে ছাড়া আরো অনেক মহিলা আছে। আপনি না হয় বাঁদীকে জিজ্ঞাসা করুন সে আপনাকে সত্য কথা বলবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন (বাঁদী) বারীরাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন। হে বারীরা! তুমি কি তার মধ্যে সন্দেহজনক কিছু দেখতে পেয়েছ? বারীরা বলল, আপনাকে যিনি সত্যসহ পাঠিয়েছেন, তার কসম করে বলছি, না তেমন কিছু দেখিনি এই একটি অবস্থায়ই দেখেছি যে তিন অল্পবয়স্কা কিশোরী। আর তাই আটা-খামীর গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। সেই ফাকে বকরী এসে তা খেয়ে ফেলে। সে দিনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মসজিদে) ভাষণ দিতে দাঁড়িয়ে আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সালুলের ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচার উপায় জিজ্ঞাসা করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার পরিবারকে কেন্দ্র করে যে লোক আমাকে জ্বালাতন করেছে, তার মুকাবিলায় কে প্রতিকার করবে? আল্লাহর কসম, আমি তো আমার স্ত্রী সম্পর্কে ভালো ছাড়া অন্য কিছু জানিনা। আর এমন ব্যাক্তিকে জড়িয়ে তারা কথা তুলেছে, যার সম্পর্কে ভালো ছাড়া অন্য কিছু আমি জানিনা আর সে তো আমার সাথে ছাড়া আমার ঘরে কখনও প্রবেশ করত না।
তখন সা’দ ইবনু মু’আয (রাঃ) দাঁড়িয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর কসম, আমি তার প্রতিকার করবো। যদি সে আউস গোত্রের কেউ হয়ে থাকে, তাহলে তার গর্দান উড়িয়ে দিব; আর যদি সে আমাদের খাযরাজ গোত্রীয় ভাইদের কেউ হয়, তাহলে আপনি তার ব্যাপারে আমাদের নির্দেশ দিবেন, আমরা আপনার নির্দেশ পালন করব। খাযরাজ গোত্রপতি সা’দ ইবনু উবাদা (রাঃ) তখন দাঁড়িয়ে গেলেন। এর আগে তিনি ভালো লোকই ছিলেন। আসলে গোত্র প্রীতি তাকে পেয়ে বসেছিলো। তিনি বললেন, তুমি মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কসম! তুমি তাকে হত্যা করতে পারনে না, সে শক্তি তোমার নেই। তখনি উসায়িদ ইবনুল হুযাইর (রাঃ) দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, তুমিই মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কসম! আমরা অবশ্যই তাকে হত্যা করে ছাড়ব। আসলে তুমি একজন মুনাফিক। তাই মুনাফিকদের পক্ষ হয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়েছে। এরপর আউস ও খাযরাজ উভয় গোত্রই উত্তেজিত হয়ে উঠলো। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারে থাকা অবস্থায়ই তারা (লড়াইয়ে) উদ্যত হল। তখন তিনি নেমে তাদের চুপ করালেন। এতে সবাই শান্ত হল আর তিনিও নীরবতা অবলম্বন করলেন।
আয়িশা (রাঃ) বলেন, সেদিন সারাক্ষণ আমি কাঁদলাম, চোখের পানি আমার শুকালনা এবং ঘুমের সামান্য পরশও পেলাম না। আমার পিতা-মাতা আমার পাশে পাশেই থাকলেন। পুরো রাত দিন আমি কেদেই কাটালাম। আমার মনে হল, কান্না বুঝি আমার কলিজা বিদীর্ণ করে দিবে। তিনি (আয়িশা) বলেন, তারা (পিতা-মাতা) উভয়ে আমার কাছেই বসা ছিলেন, আর আমি কাঁদছিলাম। ইতিমধ্যে এক আনসারী মহিলা ভিতরে আসার অনুমতি চাইল। আমি তাকে অনুমতি দিলাম। সেও আমার সঙ্গে বসে কাঁদতে শুরু করল। আমরা এ অবস্থায় থাকতেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবেশ করে (আমার কাছে) বসলেন, অথচ যে দিন থেকে আমার সম্পর্কে অপবাদ রটানো হয়েছে সেদিন থেকে তিনি আমার কাছে বসেননি। এর মধ্যে একমাস কেটে গিয়েছিল। অথচ আমার সম্পর্কে তার কাছে কোন ওয়াহী নাযিল হল না।
তিনি (আয়িশা) বলেন, এরপর হামদ ও সানা পাঠ করে তিনি বললেন, হে আয়িশা! তোমার সম্পর্কে এ ধরনের কথা আমার কাছে পৌছেছে। তুমি নির্দোষ হলে আল্লাহ্ অবশ্যই তোমার নির্দোষিতা ঘোষনা করবেন। আর যদি তুমি কোন গুনাহে জড়িয়ে গিয়ে থাক, তাহলে আল্লাহর কাছে তাওবা ও ইসতিগফার কর। কেননা, বান্দা নিজের পাপ স্বীকার করে তওবা করলে আল্লাহ তাওবা কবুল করেন। তিনি যখন তার বক্তব্য শেষ করলেন, তখন আমার অশ্রু বন্ধ হয়ে গেল। এমনকি এক বিন্দু অশ্রুও আমি অনুভব করলাম না। আমার পিতাকে বললাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আমার তরফ থেকে জওয়াব দিন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, আমি বুঝে উঠতে পারি না, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কি বলব? এরপর আমার (মা-কে) বললাম, আমার তরফ থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথার জওয়াব দিন। তিনিও বললেন, আল্লাহর কসম! আমি বুঝি উঠতে পারি না, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কি বলব?
আমি তখন অল্প বয়স্কা কিশোরী! কুরআনও খুব বেশী পড়িনি। তবুও আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমার জানতে বাকী নেই যে, লোকেরা যা রটাচ্ছে, তা আপনারা শুনতে পেয়েছেন এবং আপনাদের মনে তা বসে গেছে, ফলে আপনারা তা বিশ্বাস করে নিয়েছেন। এখন যদি আমি আপনাদের বলি যে, আমি নিষ্পাপ আর আল্লাহ জানেন, আমি অবশ্যই নিষ্পাপ, তবু আপনারা আমার সে কথা বিশ্বাস করবেন না। আর যদি আপনাদের কাছে কোন বিষয় আমি স্বীকার করি, অথচ আল্লাহ জানেন আমি নিষ্পাপ তাহলে অবশ্যই আপনারা আমাকে বিশ্বাস করে নিবেন। আল্লাহর কসম, ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) এর পিতার ঘটনা ছাড়া আমি আপনাদের জন্য কোন দৃষ্টান্ত খুজে পাচ্ছি না। যখন তিনি বলেছিলেন, পূর্ণ ধৈর্যধারনই আমার জন্য শ্রেয়। আর তোমরা যা বলছো সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যকারী।
এরপর আমি আমার বিছানায় পার্শ্ব পরিবর্তন করে নিলাম। এটা আমি অবশ্যই আশা করছিলাম যে, আল্লাহ আমাকে নির্দোষ ঘোষনা করবেন। কিন্তু আল্লাহর কসম! এ আমি ভাবিনি যে, আমার ব্যাপারে কোন ওয়াহী নাযিল হবে। কুরআনে আমার ব্যাপারে কোন কথা বলা হবে, এ বিষয়ে আমি নিজেকে উপযুক্ত মনে করি না। তবে আমি আশা করছিলাম যে, নিদ্রায় আল্লাহর রাসূল এমন কোন স্বপ্ন দেখবেন, যা আমাকে নির্দোষ প্রমাণ করবে। কিন্তু আল্লাহর কসম! তিনি তার আসন ছেড়ে তখনও উঠে যাননি এবং ঘরের কেউ বেরিয়েও যায়নি, এরই মধ্যে তার উপর ওয়াহী নাযিল হওয়া শুরু হয়ে গেল এবং (ওয়াহী নাযিলের সময়) তিনি যে রূপ কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতেন, সে রূপ অবস্থার সম্মুখীন হন। এমনকি সে মুহুর্তে শীতের দিনেও তার শরীর থেকে মুক্তার ন্যায় ফোটা ফোটা ঘাম ঝরে পড়তো।
যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ওয়াহীর সে অবস্থা কেটে গেল, তখন তিনি হাসছিলেন। আর প্রথম যে বাক্যটি তিনি উচ্চারন করলেন তা ছিল এই যে, আমাকে বললেন, হে আয়িশা! আল্লাহর প্রশংসা করো। কেননা, তিনি তোমাকে নির্দোষ ঘোষনা করেছেন। আমার মাতা তখন আমাকে বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে যাও। (কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর) আমি বললাম, না, আল্লাহর কসম! আমি তার কাছে যাবো না এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো প্রশংসাও করব না। আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করেন ‏إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالإِفْكِ عُصْبَةٌ مِنْكُمْ যথন আমার সাফাই সম্পর্কে নাযিল হল তখন আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! নিকটাত্মীয়তার কারণে মিসতাহ্ ইবনু উসাসার জন্য তিনি যা খরচ করতেন, আয়িশা (রাঃ) সম্পর্কে এ ধরনের কথা বলার পর মিসতার জন্য আমি আর কখনও খরচ করবো না।
তখন আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করলেন ‏وَلاَ يَأْتَلِ أُولُو الْفَضْلِ مِنْكُمْ وَالسَّعَةِ‏}‏ إِلَى قَوْلِهِ ‏{‏غَفُورٌ رَحِيمٌ‏ তোমাদের মধ্যে যারা নিয়ামতপ্রাপ্ত ও স্বচ্ছল, তারা যেন দান না করার কসম না করে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও মেহেরবান। তখন আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম। আমি অবশ্যই চাই আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। এরপর তিনি মিসতাহ্ কে যা দিতেন, তা পুনরায় দিতে লাগলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়নাব বিনতে জাহাশকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি বললেন, হে যায়নাব! (আয়িশা সম্পর্কে) তুমি কি জানো? তুমি কি দেখছো? তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আমার কান, আমি আমার চোখের হিফাজত করতে চাই আল্লাহর কসম তার সম্পর্কে ভালো ছাড়া অন্য কিছু আমি জানিনা। আয়িশা (রাঃ) বলেন, অথচ তিনই আমার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন। কিন্তু পরহেযগারীর কারণে আল্লাহ তার হিফাযত করেছেন।
আবূ রাবী (রহঃ) ... আয়িশা ও আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়র (রাঃ) থেকে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। ফুলাইহ্ (রহঃ) ... কাসিম ইবনু মুহাম্মদ ইবনু আবূ বকর (রাঃ) থেকে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেন।
হাদীস নং-২৪৮৬। মুহাম্মদ ইবনু সালাম (রহঃ) ... আবূ বকর (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে এক ব্যাক্তি অপর এক ব্যাক্তির প্রশংসা করল। তখন তিনি (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমার জন্য আফসোস! তুমি তো তোমার সাথীর গর্দান কেটে ফেললে, তুমি তো তোমার সাথীর গর্দান কেটে ফেললে। তিনি একথা কায়েকবার বললেন, এরপর তিনি বললেন, তোমাদের কেউ যদি তার (মুসলমান) ভাইয়ের প্রশংসা করতেই চায় তাহলে তার (এভাবে) বলা উচিত, অমুককে আমি এরূপ মনে করি, তবে আল্লাহই তার সম্পর্কে অধিক জানেন। আর আল্লাহর প্রতি সোপর্দ না করে আমি কারো সাফাই পেশ করি না। তার সম্পর্কে ভালো কিছু জানা থাকলে বলবে, আমি তাকে এরূপ এরূপ মনে করি।
হাদীস নং-২৪৮৭। মুহাম্মদ ইবনু সাব্বাহ (রহঃ) ... আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যাক্তি অপর এক ব্যাক্তির প্রশংসা করতে শুনে বললেন, তোমরা তাকে ধ্বংস করে দিলে কিংবা (রাবীর সন্দেহ) বলেছেন, তোমরা লোকটির মেরুদন্ড ভেঙ্গে ফেলললে।
হাদীস নং-২৪৮৮। উবায়দুল্লাহ ইবনু সাঈদ (রহঃ) ... ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, উহুদ যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে তাকে (ইবনু উমরকে) পেশ করলেন, তখন তিনি চৌদ্দ বছরের বালক। (ইবনু উমর বলেন) তখন তিনি আমাকে (যুদ্ধে গমনের) অনুমতি দেননি। পরে খন্দকের যুদ্ধে তিনি আমাকে পেশ করলেন এবং অনুমতি দিলেন। তখন আমি পনের বছরের যুবক।
নাফি (রহঃ) বলেন, আমি খলীফা উমর ইবনু আবদুল আযীযের কাছে গিয়ে এ হাদীস শোনালাম। (হাদীস শুনে) তিনি বললেন, এটাই হচ্ছে প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত বয়সের সীমারেখা। এরপর তিনি তার গভর্নরদেরকে লিখিত নির্দেশ পাঠালেন যে, (সেনাবাহিনীতে) যাদের বয়স পনেরতে উপনীত হয়েছে তাদের জন্য যেন ভাতা নির্ধারণ করেন।
হাদীস নং-২৪৮৯। আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) ... আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্কের উপর জুম্মা দিবসের গোসল কর্তব্য।
হাদীস নং-২৪৯০। মুহাম্মদ (রহঃ) ... আবদুল্লাহ (ইবনু মাস’উদ) (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যাক্তি কোন মুসলমানের সম্পদ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে মিথ্যা শপথ করবে, (কিয়ামতের দিন) সে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে এমন অবস্থায় যে আল্লাহ তার উপর অত্যন্ত অসন্তুষ্ট। রাবী বলেন, তখন আশআস ইবনু কায়স (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম। এ বর্ণনা আমার ব্যাপারেই। একখন্ড জমি নিয়ে (জনৈক) ইয়াহুদী ব্যাক্তির সাথে আমার বিবাদ ছিল। সে আমাকে অস্বীকার করলে আমি তাকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে হাযির করলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, তোমার কি কোন প্রমাণ আছে! আসআস (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, না (কোন প্রমাণ নেই।) তখন তিনি (উক্ত ইয়াহুদীকে) বললেন, তুমি কসম কর। আশআস (রাঃ) বলেন, (একথা শুনে) আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তবে তো সে (মিথ্যা) কসম করে আমার সম্পদ আত্মসাত করে ফেলবে। আশআস (রাঃ) বলেন, তখন আল্লাহ তা’আলা আয়াত নাযিল করেনঃ যারা আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা এবং নিজের শপথকে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করে ... (৩ঃ ৭৭)
হাদীস নং-২৪৯১। আবূ নু’আইম (রহঃ) ... ইবনু আবূ মূলায়কা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইবনু আব্বাস (রাঃ) আমাকে লিখে জানিয়েছেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফায়াসালা দিয়েছেন যে, বিবাদীকে কসম করতে হবে।
হাদীস নং-২৪৯২। উসমান ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) ... আবদুল্লাহ (ইবনু মাস’উদ) (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে এমন (মিথ্যা) কসম করে, যা দ্বারা মাল প্রাপ্ত হয়। সে (কিয়ামতের দিন) আল্লাহর সঙ্গে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে যে, আল্লাহ তার উপর অসন্তুষ্ট, তারপর আল্লাহ্ তা’আলা উক্ত বর্ণনার সমর্থনে আয়াত নাযিল করেনঃ যারা আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা এবং নিজেদের শপথকে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করে ...... তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। (৩ঃ ৭৭) এরপর আশআস ইবনু কায়স (রাঃ) আমাদের কাছে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, আবূ আবদুর রাহমান  তোমাদের কি হাদীস শুনিয়েছেন? আমরা তার বর্ণিত হাদীসটি তাকে শোনালাম। তিনি বললেন, তিনি (ইবনু মাসউদ) ঠিকই বলেছেন। আমার ব্যাপারেই আয়াতটি নাযিল হয়েছে।
কিছু একটা নিয়ে আমার সাথে এক (ইয়াহুদী) ব্যাক্তির বিবাদ ছিল। আমরা উভয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আমাদের বিবাদ উত্থাপন করলাম। তখন আমি বললাম, তবে তো সে মিথ্যা কসম করতে কোন দ্বিধা করবে না। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কেউ যদি এমন কসম করে, যার দ্বারা মাল প্রাপ্ত হয় এবং সে যদি উক্ত ব্যাপারে মিথ্যাবাদী হয়, তা হলে (কিয়ামতের দিন) সে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে এমন অবস্থায়, আল্লাহ তার উপরে অসন্তুষ্ট। এরপর আল্লাহ তা’আলা এ বর্ণনার সমর্থনে আয়াত আয়াত নাযিল করেন। একথা বলে তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন।
হাদীস নং-২৪৯৩। মুহাম্মদ ইবনু বাশশার (রহঃ) ... ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হিলাল ইবনু উমাইয়া নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে তার স্ত্রী বিরুদ্ধে শারীক ইবনু সাহমা এর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ করলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হয় তুমি প্রমাণ (সাক্ষী) পেশ করবে, নয় তোমার পিঠে (বেত্রাঘাতের) দন্ড আপতিত হবে। সে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ আমাদের কেউ কি আপন স্ত্রী উপর অপর কোন পুুরুষকে দেখে প্রমাণ সংগ্রহের জন্য ছুটে যাবে? কিন্তু নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একই কথা (বার বার) বলতে থাকলেন, হয় প্রমাণ পেশ করবে, নয় তোমার পিঠে বেত্রাঘাতের দন্ড আপতিত হবে। তারপর তিনি লি’আন (لعان) সংক্রান্ত হাদীস বর্ণনা করলেন।
হাদীস নং-২৪৯৪। আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিন শ্রেণীর ব্যাক্তির সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা কথা বলবেন না এবং (করুণার দৃষ্টিতে) তাদের প্রতি তাকাবেন না এবং তাদের পাপ মোচন করবেন না আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। প্রথম শ্রেণীর ব্যাক্তি সে, যার কাছে অতিরিক্ত পানি রয়েছে রাস্তার পাশে, আর সে পানি থেকে মূসাফিরকে বঞ্চিত রাখে। আর এক শ্রেণীর ব্যাক্তি সে, যে কারো আনুগত্যের বায়আত করে এবং একমাত্র দুনিয়ার গরযেই সে তার করে। ফলে চাহিদা মাফিক তাকে দিলে সে অনুগত থাকে, আর না দিলে অনুগত থাকে না। আর এক শ্রেণীর ব্যাক্তি সে যে আসরের পর কারো সাথে পণ্য নিয়ে দামদর করে এবং আল্লাহর নামে মিথ্যা হলফ করে বলে যে, সে ক্রয় করতে এত মূল্য দিয়েছে আর তা শুনে ক্রেতা কিনে নেয়।
হাদীস নং-২৪৯৫। মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) ... ইবনু মাস’উদ (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যাক্তি সম্পদ আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে (মিথ্যা) কসম করবে (কিয়ামতের দিন) সে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করাবে এমন অবস্থায় যে আল্লাহ তার প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট থাকবেন।
হাদীস নং-২৪৯৬। ইসহাক ইবনু নাসর (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, একদল লোককে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলফ করতে বললেন। তখন (কে কার আগে হলফ করবে এ নিয়ে) তাড়াহুড়া শুরু করে দিল। তখন তিনি কে (আগে) হলফ করবে, তা নির্ধারনের জন্য তাদের নামে লটারী করার নির্দেশ দিলেন।
হাদীস নং-২৪৯৭। ইসহাক (রহঃ) ... আবদুল্লাহ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক লোক তার মালপত্র বাজারে এনে এবং হলফ করে বলল যে, এগুলো (খরিদ বাবদ) সে এত দিয়েছে, অথচ সে তত দেয়নি। তখন আয়াত নাযিল হলঃ যারা নগণ্য মূল্যের বিনিময়ে আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা এবং নিজের শপথ বিক্রি করে ...। ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) বলেন, (দাম চড়ানোর মতলবে) যে ধোকা দেয়, সে মূলতঃ সুদখোর ও খিয়ানতকারী।
হাদীস নং-২৪৯৮। বিশর ইবনু খালিদ (রহঃ) ... আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, যে ব্যাক্তি কারো অথবা তার ভাইয়ের অর্থ আত্মসাতের মতলবে মিথ্যা হলফ করবে, সে (কিয়ামতে) মহান আল্লাহর দেখা পাবে এমন অবস্থায় যে, তিনি তার উপর অত্যন্ত অসন্তুষ্ট। অতঃপর আল্লাহ্ তা’আলা উক্ত হাদীসের সমর্থনে কুরআনে এই আয়াত নাযিল করলেনঃ إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَأَيْمَانِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلاً‏  হতে ولهم عذاب পর্যন্ত। যারা আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা এবং নিজেদের শপথ তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করে, আখিরাতে তাদের কোন অংশ নেই (৩ঃ ৭৭)।
আর আল্লাহ্ কিয়ামতের দিন তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদের প্রতি (করুণার দৃষ্টিতে) তাকাবেন না এবং তাদেরকে (পাপ থেকে) বিশুদ্ধও করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। পরে আশআস (রাঃ) আমার সঙ্গে দেখা করে জিজ্ঞাসা করলেন, আবদুল্লাহ (রাঃ) আজ তোমাদের কি হাদীস শুনিয়েছেন? আমি বললাম, এই এই (হাদীস শুনিয়েছেন) তিনি বললেন, আমার ব্যাপারেই আয়াতটি নাযিল হয়েছে।
হাদীস নং-২৪৯৯। ইসমাঈল ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) ... তালহা ইবনু উবাদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে তাকে ইসলাম (এক করণীয়) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে লাগল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, দিনে রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ)। সে বলল, আমার উপর আরও কিছু ওয়াজিব আছে? তিনি বললেন, না, নেই। তবে নফল হিসাবে পড়তে পার। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আর রমাযন মাসের সিয়াম। সে জিজ্ঞাসা করল, আমার উপর এ ছাড়া আরও কি ওয়াজিব আছে? তিনি বললেন, না, নেই। তবে নফল হিসাবে (সিয়াম) পালন করতে পার। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে যাকাতের কথাও বললেন; সে জানতে চাইল, আমার উপর এ ছাড়া আরও কিছু ওয়াজিব আছে? তিনি বললেন, না, নেই; তবে নফল হিসাবে (সাদকা) করতে পার। তারপর লোকটি এই বলে প্রস্থান করল, আল্লাহর কসম! এতে আমি কোন কম বেশি করব না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন সত্য বলে থাকলে সে সফল হয়ে গেল।
হাদীস নং-২৫০০। মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) ... আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কারও হলফ করতে হলে সে যেন আল্লাহর নামেই হলফ করে, নতুবা চুপ করে থাকে।
হাদীস নং-২৫০১। আবদুল্লাহ ইবনু মাসলাম (রহঃ) ... উম্মু সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা আমার কাছে মামলা মোকদ্দমা নিয়ে আস। আর তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়ত প্রতিপক্ষের তুলনায় প্রমাণ (সাক্ষী) পেশ করার ব্যাপারে অধিক বাকপটু। তবে যেনে রেখ, বাকপটুতার কারণে যার অনুকূলে আমি তার ভাইয়ের প্রাপ্য হক ফায়সালা করে দেই, তার জন্য আসলে আমি জাহান্নামের অংশ নির্ধারন করে দেই। কাজেই, সে যেন তা গ্রহন না করে।
হাদীস নং-২৫০২। ইবরাহীম ইবনু হামযা (রহঃ) ... আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ সুফিয়ান (রাঃ) আমাকে খবর দিয়েছেন যে, (রোম সম্রাট) হেরাক্লিয়াস তাকে বলেছিলেন, তোমাকে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি (নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তোমাদের কি কি আদেশ করেন? তুমি বললে যে, তিনি তোমাদেরকে সালাত (নামায/নামাজ)-এর, সত্যবাদিতার, পবিত্রতার, ওয়াদা পূরণের ও আমানত আদায়ের আদেশ দেন। হিরাক্লিয়াস বললেন, এটাই (অবশ্যই) নাবীগণের সিফাত (গুণাবলী)
হাদীস নং-২৫০৩। কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুনাফিকের আলামত তিনটি- বলতে গেলে মিথ্যা বলে, আমানত রাখলে (তাতে) খিয়ানত কর, আর ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে।
হাদীস নং-২৫০৪। ইবরাহীম ইবনু মূসা (রহঃ) ... জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাতের পর আবূ বকর (রাঃ) এর কাছে (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নিয়োগকৃত বাহরাইনের শাসক) আলা ইবনু হাযরামীর পক্ষ থেকে মালপত্র এসে পৌছল। তখন আবূ বরক (রাঃ) ঘোষণা করলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যিম্মায় কারো কোন ঋন (পাওনা) থাকলে কিংবা তার পক্ষ থেকে কোন ওয়াদা থাকলে সে যেন আমাদের কাছে এসে তা নিয়ে যায়। জাবির (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এরূপ, এরূপ এবং এরূপ দান করার ওয়াদা করেছিলেন। জাবির (রাঃ) তার দু’হাত তিনবার ছড়িয়ে দেখালেন। জাবির (রাঃ) বলেন, তখন তিনি [আবূ বকর (রাঃ)] আমার দু’হাতে গুণে গুণে পাঁচ শ' দিলেন, আবার পাঁচ শ' দিলেন, আবার পাচ শ' দিলেন।
হাদীস নং-২৫০৫। মুহাম্মদ ইবনু আবদুর রাহীম (রহঃ) ... সাঈদ ইবনু জুবায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হীরাতের জনৈক ইয়াহুদী আমাকে প্রশ্ন করল, দুই মুদ্দতের কোনটি মূসা (আলাইহিস সালাম) পূর্ণ করেছিলেন? আমি বললাম, আরবের কোন জ্ঞানীর কাছে গিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা না করে আমি বলতে পারব না। পরে ইবনু আব্বাসের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, মূসা (আলাইহিস সালাম) দীর্ঘতর ও উত্তর সীমাই পূর্ণ করেছিলেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেন, তা করেন।
হাদীস নং-২৫০৬। ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) ... আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হে মুসলিম সমাজ! কি করে তোমরা আহলে কিতাবদের নিকট জিজ্ঞাসা কর? অথচ আল্লাহ্ তার নাবীর উপর যে, কিতাব অবর্তীণ করেছেন, তা আল্লাহ সম্পর্কিত নবতর তথ্য সম্বলিত, যা তোমরা তিলাওয়াত করছ এবং যার মধ্যে মিথ্যার কোন সংমিশ্রন নেই। তদুপরি আল্লাহ তোমাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, আহলে কিতাবরা আল্লাহ যা লিখে দিয়েছিলেন, তা পরিবর্তন করে ফেলেছেন এবং নিজ হাতে সেই কিতাবের বিকৃতি সাধন করে তা দিয়ে তুচ্ছ মূল্যের উদ্দেশ্যে প্রচার করেছে যে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকেই অবতীর্ণ। তোমাদেরকে প্রদত্ত মহাজ্ঞান কি তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করার ব্যাপারে তোমাদের বাধা দিয়ে রাখতে পারে না? আল্লাহর শপথ! তাদের একজনকেও আমি কখনো তোমাদের উপর যা নাযিল হয়েছে সে বিষয়ে তোমাদের জিজ্ঞাসা করতে দেখিনি।
হাদীস নং-২৫০৭। উমর ইবনু হাফস ইবনু গিয়াস (রহঃ) ... নু’মান ইবনু বশীর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখার ব্যাপারে শিথিলতা প্রদর্শন করা এবং তা লংঘনকারী ব্যাক্তির উপমা হল সেই যাত্রীদল, যারা কুর’আর মাধ্যমে এক নৌযানে নিজেদের স্থান নির্ধারণ করে নিল। ফলে কারো স্থান হল এর নীচতলায় আর কারও হল উপরতলায়। যারা নীচতলায় ছিল তারা পানি নিয়ে উপর তলা লোকদের কাছ দিয়ে আসত। এতে তারা বিরক্তি প্রকাশ করল। তখন এক লোক কুড়াল নিয়ে নৌযানের নীচের অংশে ফুটো করতে লেগে গেল। এ দেখে উপর তলার লোকজন তাকে এসে জিজ্ঞাসা করল তোমার হয়েছে কি? সে বলল, আমাদের কারণে তোমরা কষ্ট পেয়েছ। অথচ আমারও পানি প্রয়োজন আছে। এ মুহুর্তে তারা যদি এর দু’হাত চেপে ধরে তাহলে তাকে যেমন রক্ষা করা হল তেমনি নিজেদেরও রক্ষা হল। আর যদি তাকে ছেড়ে দেয় তবে তাকে ধ্বংস করা হল এবং নিজেদেরও ধ্বংস করা হল।
হাদীস নং-২৫০৮। আবূল ইয়ামন (রহঃ) ... উম্মুল আলা (রাঃ) একজন আনসারী মহিলা যিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর (হাতে) বায়আত হয়েছিলেন, তিনি বলেন, মুহাজিরদের বাসস্থান দানের জন্য আনসারগণ যখন কুর’আ নিক্ষেপ করলেন, তখন তাদের ভাগে উসমান ইবন মাযউনের জন্য বাসস্থান দান নির্ধারিত হল। উম্মুল আলা (রাঃ) বলেন, সেই থেকে উসমান ইবনু মাযউন (রাঃ) আমাদের এখানে বসবাস করতে থাকেন। এরপর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে আমরা তার সেবা শুশ্রুষা করলাম। পরে তিনি যখন মারা গেলেন এবং আমরা তাকে কাফন পরালাম, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের এখানে আসলেন। আমি (উসমান ইবনু মাযউনকে লক্ষ্য করে) বললাম, হে আবূ সায়িব! তোমার প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। তোমার সম্পর্কে আমার সাক্ষ্য এই যে, আল্লাহ তোমাকে অবশ্য মর্যাদা দান করেছেন।
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তোমাকে কে জানাল যে, আল্লাহ তাকে মর্যাদা দান করেছেন। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক। আমি জানি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর কসম। উসমানের কাছে তো মৃত্যু এসে গেছে, আমি তো তার জন্য কল্যাণের আশা করি। আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর রাসূল হওয়া সত্ত্বেও জানিনা তার সাথে কি আচরণ করা হবে। তিনি (উম্মুল আলা) বলেন, আল্লাহর কসম, একথার পরে কখনো আমি কাউকে পূত পবিত্র বর্ণনা করি না। সে কথা আমাকে চিন্তায় ফেলে দিল। তিনি বলেন, পরে আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, উসমান ইবনু মাযউন (রাঃ) এর জন্য একটা প্রস্রবণ প্রবহিত হচ্ছে। এরপর আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে তাকে সে খবর জানালাম। তিনি বলেন, সেটা হচ্ছে তার নেক আমল।
হাদীস নং-২৫০৯। মুহাম্মদ মুকাতিল (রহঃ) ... আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরের ইরাদা করলে তার স্ত্রীদের মাঝে কুর’আ নিক্ষেপ করতেন, যার নাম বের হত। তাকে সাথে নিয়েই তিনি সফরে বের হতেন। তিনি স্ত্রীদের প্রত্যেকের জন্যই দিন রাত বন্টন করতেন। তবে সাওদা বিনত যাম’আ (রাঃ) তার ভাগের দিনরাত নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রী আয়িশা (রাঃ) কে দান করে দিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তা করেছিলেন।
হাদীস নং-২৫১০। ইসমাঈল (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আযান ও প্রথম কাতারের মর্যাদা মানুষ যদি জানত আর (প্রতিযোগিতার কারণে) কুর’আ নিক্ষেপ ছাড়া সে সুযোগ তারা না পেত, তাহলে কুর’আ নিক্ষেপ করত, তেমনি আগেভাগে জামা’আতে শরীক হওয়ার মর্যাদা যদি তারা জানত তাহলে তারা সেদিকে ছুটে যেত। অনুরূপভাবে ঈশা ও ফজরের জামা’আতে শরীক হওয়ার মর্যাদা যদি তারা জানত তা হলে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তারা তাতে হাযির হত।